কার্বন অফসেট কী, কেন, কীভাবে - ড. আবেদ চৌধুরী ও জাকিয়া মালিহা

কার্বন অফসেট কী, কেন, কীভাবে

ড. আবেদ চৌধুরী ও জাকিয়া মালিহা

তাপমাত্রা বাড়ার অন্যতম কারণ গ্রিনহাউস গ্যাসকে বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ করার জন্য অনেক রকমের পদ্ধতি ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। কার্বন অফসেট পদ্ধতি সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য একটি পন্থা।

কার্বন অফসেট হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড বা অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো, যা চলমান নির্গমনরত বিধ্বংসী গ্যাস অথবা নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসকে সরিয়ে নিতে অর্থায়ন করে। বায়ুমণ্ডলে যারা কার্বন নির্গমন করবে, সেই কার্বনকে অপসারণ করার জন্য জরিমানা হিসেবে তারা অর্থ ব্যয় করবেন। বায়ুমণ্ডলে যে কার্বন ইতোমধ্যে জমা হয়ে আছে, তা অপসারণে কার্বন অফসেট পদ্ধতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। 

জমি পুনরুদ্ধার বা গাছ লাগানো বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া ব্যবহাপরের মাধ্যমে কার্বন অফসেট পদ্ধতিটি বাস্তবায়ন করা হয়। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তাদের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে যে কার্বন নির্গমন করে, তা অপসারণে অন্য একটি গ্রুপকে অর্থ সরবরাহ করবে, যারা গাছ লাগানো বা কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন করার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে জমাকৃত কার্বন ডাই-অক্সাইডকে মাটিতে কার্বন হিসেবে ফিরিয়ে এনে তা স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করবে অথবা গাছের ব্যবহার উপযোগী জৈব কার্বনে পরিণত করবে। তারা কতটুকু কার্বন অপসারণ করেছে তার একটি গাণিতিক হিসাব দেখিয়ে নির্গমনকারীদের কাছ থেকে সে অনুযায়ী অর্থ আদায় করে নেবে।

যেসব প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্বন অফসেট করা যাবে-

🟢১. সালোকসংশ্নেষণ :

সালোকসংশ্নেষণ প্রাকৃতিকভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করে। গাছ বিশেষ করে সালোকসংশ্নেষণের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন সরাসরি অপসারণ করে তা মাটিতে এবং নিজ দেহে সংরক্ষণ করে রাখে। বন সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ, পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সালোকসংশ্নেষণ প্রক্রিয়া বাড়ানোর মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের অপসারিত কার্বনকে কাঠ ও মাটিতে সংরক্ষণ করতে হবে।

🟢২. রিজেনারেটিভ কৃষি ব্যবস্থা :

মাটিতে কার্বন বাড়ানোর অনেক উপায় আছে। যখন জমি অন্যথায় খালি থাকে তখন কভার ফসল রোপণ করে সারাবছর সালোকসংশ্নেষণ প্রসারিত করা যাবে এবং প্রতি একরে প্রতি বছর প্রায় অর্ধ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সিকোয়েস্ট্রেশন করা সম্ভব হবে। কম্পোস্টের ব্যবহার মাটিতে কম্পোস্টের কার্বন উপাদান সংরক্ষণের মাধ্যমে ফলন উন্নত করতে পারে। বিজ্ঞানীরা গভীর শিকড়সহ ফসল উদ্ভাবন করেছেন, যা মাটিতে অধিক কার্বন জমা করে। মাটিতে কার্বন সংরক্ষণ করা কৃষক এবং খামারিদের জন্যও ভালো। কারণ এটি মাটির স্বাস্থ্য এবং ফসলের ফলন বাড়াতে পারে। 

🟢৩. ডিরেক্ট কার্বন ক্যাপচার :

ডিরেক্ট কার্বন ক্যাপচার হলো, বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সরাসরি অপসারণ করে মাটির নিচে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয়। এই নতুন প্রযুক্তিটি কার্বন ক্যাপচার এবং স্টোরেজ প্রযুক্তির অনুরূপ, যা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্প সুবিধাগুলোর মতো উৎস থেকে নির্গমন ক্যাপচার করতে ব্যবহূত হয়। পার্থক্য হলো এই যে, ডিরেক্ট কার্বন ক্যাপচার বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি অতিরিক্ত কার্বন সরিয়ে নেয়। অর্থাৎ ক্যাপচার করার জন্য কোনো উৎসের প্রয়োজন পড়ে না। 

🟢৪. বায়োচার :

বায়োচার মাটিতে কার্বন প্রবেশের আরেকটি উপায়। বায়োচার হলো এক ধরনের চারকোল বা কাঠ-কয়লা। ফসলের অবশিষ্টাংশ, ঘাস, গাছ বা অন্যান্য উদ্ভিদ থেকে জৈববস্তু ৩০০-৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে পুড়িয়ে বায়োচার তৈরি করা হয়। এ পদ্ধতিটি পাইরোলাইসিস নামে পরিচিত, যা জৈব বস্তুর কার্বন ক্ষয় প্রতিরোধ করতে সক্ষম। 

🟢৫. কার্বন খনিজকরণ :

কিছু খনিজ প্রাকৃতিকভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কার্বনকে গ্যাস থেকে কঠিন পদার্থে পরিণত করে। প্রক্রিয়াটিকে সাধারণত কার্বন খনিজকরণ বলা হয় এবং এটি প্রাকৃতিকভাবে খুব ধীরে ধীরে; শত বা হাজার বছর ধরে ঘটে। বিজ্ঞানীরা বের করছেন কীভাবে কার্বন খনিজকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা যায়। এ পদ্ধতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে উপযুক্ত রক বা শিলাতে ইনজেক্ট করা হয়, যা বিক্রিয়ার মাধ্যমে গ্যাসীয় কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে কঠিন কার্বনেটে পরিণত হয়। 

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা রিজেনারেটিভ কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্বন অফসেট করার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন সরিয়ে মাটিতে ফিরিয়ে আনতে রিজেনারেটিভ কৃষি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কার্বন অফসেটিং প্রকল্পগুলো বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করার পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায়ের যত্ন নিতে সাহায্য করে। অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য উন্নতি, জীববৈচিত্র্য, বনভূমি এবং বিস্তৃত সামাজিক সুবিধা প্রদান করে।

একজন ব্যক্তি কী টাইপের গাড়ি চালাচ্ছেন আর কত মাইল চালিয়েছেন তার হিসাব, গণপরিবহন ব্যবহার, বিমান ভ্রমণের মোট সময়, বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদির পরিমাণ হিসাব করে বার্ষিক নির্গমনের হার নির্ণয় করা হয়। আর তার ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশের ওপর কী রূপ পড়ছে তাও খতিয়ে দেখা হয়। তারপর পরিবেশের ওপর এই ক্ষতির প্রভাব পরিমাপ করার পর সে ক্ষতিকে হ্রাস করার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ, অফসেট ব্যয় করতে হয়। 

সাধারণ কার্বন অফসেটগুলোর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়; প্রতি টন ১০ ডলারেরও কম থেকে ৫০ ডলারেরও বেশি। অফসেট প্রজেক্টের ধরন, এটি কোথায় অবস্থিত এবং কীভাবে এটি চালানো হয় তার ওপর দাম অনেক বেশি নির্ভর করে। যদিও দামের পরিসর বিস্তৃত, স্বেচ্ছায় কার্বন মার্কেট ইস্যু বহনকারী কার্বন ক্রেডিটের সাধারণ খরচ কার্বন ডাই-অক্সাইড অফসেট প্রতি টনের জন্য ইউএস ডলার ১২ থেকে ২০-এর মধ্যে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণের দাম ৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেঞ্চমার্ক কার্বনের দাম ৫৬ দশমিক ৩৪ ইউরো প্রতি টনে বন্ধ হয়েছে, যা কার্বন মার্কেট শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ স্তরের কাছাকাছি। 

একজন ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী যিনিই হোন, সম্ভাব্য সব উপায়ে নির্গমন পরিমাপ করা এবং কমানো উচিত। নির্গমন হ্রাস শক্তি সঞ্চয় করে। যার ফলে অর্থ সাশ্রয় হয়, যা বেশিরভাগ মানুষ ও কোম্পানি চায়। এটি পরিবেশকেও উপকৃত করে; বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা দ্রুত বাড়ানো রোধে সাহায্য করে; বিশ্বকে উষ্ণায়নের কবল থেকে রক্ষা করার সুযোগ দেয়। 

যদিও আমরা এনার্জির ব্যবহার এবং অন্যান্য কার্বন নিবিড় ক্রিয়াকলাপ থেকে নির্গমন কমাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে পারি, তবুও অফসেট না করে সম্পূর্ণ কার্বন-নিরপেক্ষ হওয়ার কোনো উপায় নেই। কার্বন অফসেট করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিরপেক্ষ কার্বন নির্গমনকারী হিসেবে গণ্য হতে পারেন। পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি কার্বন অফসেট প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় করতে পারেন। তারা তাদের কর্মসংস্থান হিসেবে এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও উর্বর কৃষি ব্যবস্থার দেশগুলো কার্বন অফসেট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে। এতে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বেড়ে যাবে।

কার্বন অফসেট যেভাবে

রিজেনারেটিভ কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তাদের বন ও কৃষিজমিকে ব্যবহার করে কার্বন অফসেট প্রক্রিয়াটি অনুশীলন করার মাধ্যমে আয় করতে পারে। যেমন, কোনো ব্যক্তি বা করপোরেশন তার মালিকানাধীন জমিতে রিজেনারেটিভ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করবেন। চাষাবাদ করার আগে ওই জমির মাটি পরীক্ষা করে মাটিতে কার্বনের পরিমাণ নির্ণয় করবেন। মাটিতে কার্বনের পরিমাণ কতটুকু পাওয়া গেছে, তার একটি ডাটা সংগ্রহ করে রাখা হবে। এ জন্য পরিবেশ বিভাগ বা রিসার্চ ইনস্টিটিউটগুলো সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। জমিতে ফসল ফলানোর পরবর্তী সময়ে পুনরায় মাটির কার্বনের পরিমাণ বের করা হবে। এখন জমি ব্যবহারের আগে কতটুকু কার্বন পাওয়া গেছে আর পরে কতটুকু কার্বন পাওয়া গেছে তার মধ্যে পার্থক্য বের করে নিট কার্বন স্টোরেজ কতটুকু হয়েছে তা বের করতে হবে।

বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলো থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি, শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র, কলকারখানা এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ের মানুষ যারা কার্বন নির্গমনে দায়ী, তারা তাদের নিঃসৃত কার্বনকে বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ করতে বা অফসেট করতে অর্থায়ন করছে।

বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যারা তাদের জীবিকার জন্য সম্পূর্ণভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, তারা কার্বন অফসেট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীই নয়, বরং কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন সবাই এই কার্বন মার্কেটিংয়ে যোগ হতে পারেন। এতে নিজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের জন্যও একটি নির্দিষ্ট রাজস্ব আয় সম্ভব। 

লেখকদ্বয় যথাক্রমে বিজ্ঞানী এবং শিক্ষার্থী, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল




Comments

Popular posts from this blog

জিরো কুপন বন্ড কী? এইটা কিভাবে কাজ করে?

ব্যাংক ভাইবা - মোঃ ইউসুফ আলী

১ম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা-- আল-আমিন আহমেদ