শ্রীলংকার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণসমূহ

👉👉শ্রীলংকার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণসমূহ 

২০০৬ সালে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির পরে শ্রীলঙ্কার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ২০১২ সাল পর্যন্ত ঠিকঠাকই ছিল। সে সময় মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৩৬ ডলার থেকে বেড়ে হয় ৩ হাজার ৮১৯ ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। দেশটি ২০১৯ সালে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশেও পরিণত হয়েছিল। কিন্তু কোনো অর্জনই ধরে রাখতে পারেনি। প্রবৃদ্ধি কমতে থাকলে পরের বছরেই বিশ্বব্যাংক তাদের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে নামিয়ে দেয়। 

শ্রীলঙ্কার কেন মরণ দশা?👇👇

👉👉বুন উন্নয়ন: 

২০০৬ সালে যুদ্ধের শেষের দিকে শ্রীলংকা সরকার প্রচুর পরিমাণে ঋণ নিয়ে প্রবৃদ্ধির উল্লম্ফন এবং রুপির মূল্য বাড়িয়ে বিদেশী পুঁজি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। স্বল্প সময়ে সেই কৌশল ঠিকঠাক কাজও করে। অর্থনীতিতে ঊর্ধ্বগামিতা দেখা দেয়, মাথাপিছু জিডিপি ২০০৬ সালের ১ হাজার ৪৩৬ থেকে বেড়ে ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৮১৯ ডলারে দাঁড়ায়।

সে সময়ের ওই নীতি ১৬ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার বাইরে নিয়ে যায়, যেটা মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে একটি বড় সংখ্যার মধ্যবিত্তও তৈরি হয়। ২০১৯ সালে শ্রীলংকা বিশ্বব্যাংকের উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নাম লেখায়। যদিও সেই খেতাব মাত্র এক বছর স্থায়ী হয়। এ নীতির কারণে শ্রীলংকার অভ্যন্তরীণ ঋণ ২০০৬ সালের তুলনায় ২০১২ সালে তিন গুণ হয় এবং সরকারের ঋণ জিডিপির ১১৯ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়।

👉👉অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প (প্রকল্প থেকে কোনো রাজস্ব আয় হবে না এমন: 

চীনের ঋণের ফাঁদে বন্দী শ্রীলঙ্কা। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত থাকলেও বৃহৎ একাধিক অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চীন থেকে ঋণ নিয়েই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যেমন, গভীর সমুদ্রবন্দর হাম্বানটোটা নির্মাণের জন্য চীন থেকে ১৫ বছরের জন্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে, ৬ দশমিক ৩ শতাংশ সুদহারে ঋণ নিয়েছিল ৩০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। কিন্তু এই সমুদ্রবন্দর থেকে আয় হয় সামান্য, যা ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে পরিচালনার জন্য চীন থেকে নেওয়া হয় আরও ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার—২ শতাংশ সুদ হারে। তাতেও কাজ হয়নি। পরে চীনের কাছেই বন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে।);

.

👉👉ঋণের ভারে জর্জরিত (শ্রীলঙ্কার ঋণের হার এখন জিডিপির ১১৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশটি সব মিলিয়ে এক বছরে যে পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে, তার তুলনায় ঋণ বেশি। শ্রীলঙ্কার ঋণের ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ হচ্ছে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ঋণ ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ, জাপানের কাছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং চীনের কাছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ।); 

.

👉👉ঋণ পরিশোধে বেহাল অবস্থা (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য বলছে, ঋণের দায় পরিশোধ হিসেবে চলতি বছর শ্রীলঙ্কাকে সব মিলিয়ে ৫০০ কোটি ডলার পরিশোধ দেওয়া কথা। অথচ এখন শ্রীলঙ্কার হাতেই আছে মাত্র ২৩১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। সুতরাং ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, দৈনন্দিন কাজ চালাতেই নতুন করে আরও ঋণ নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে বৈদেশিক বিনিয়োগও কমেছে গত দুই বছরে। এমনকি আমাদের দেওয়া ২০০ মিলিয়ন ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।); 

👉👉কর কমানো (মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ ধার্য করেন। একই সঙ্গে ২ শতাংশ হারের নেশন উন্নয়ন কর (নেশন বিল্ডিং ট্যাক্স), যত আয় তত কর (পে অ্যাজ ইউ আর্ন—পিএইউই) ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন। এর প্রভাব পড়ে রাজস্ব আয়ে। এক বছরেই দেশটির ভ্যাট আদায় কমে যায় ৫০ শতাংশ।); 

👉👉পর্যটন ও রেমিট্যান্স খাতের বিপর্যয় (সন্ত্রাসী হামলার পর এবং কোভিড, জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১০ শতাংশ।); 

👉👉অর্গানিক চাষে বিপর্যয় (অজৈব সার আমদানি তে নিষেধাজ্ঞা, উৎপাদনের হার ৫০%  এর বেশী কমে যাওয়া, চিন থেকে আমদানিকৃত জৈবসার শ্রীলঙ্কার পরিবেশে টক্সিক পরিবেশ তৈরি করেছে তাতে করে  চিনের থেকে আমদানির অপেক্ষায় থাকা জৈব সারের শিপমেন্ট বাতিল করলেও চিন এ টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য করে।); 

এছাড়াও অন্যান্য কারণগুলো হলো 👇👇👇

(👉) আমলাতান্ত্রিক জটিলতা; 

(👉)  দুর্নীতি; 

(👉) মিস্টার ১০% (রাজাপাকসের ছেলে); 

(👉) গোষ্ঠীতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্র(পারিবারিক রাজনীতি) 

(👉) Kleptocracy, kleptomaniac and money laundering; 

(👉) Crony Capitalism (স্বজনতোষণ অর্থনীতি); 

(👉) করোনার প্রভাব; 

(👉) কোভিডের কারণে RMG তে ধ্বস (নিরাপত্তার অভাবে পোশাকশিল্প ’৮০-এর দশকে চলে আসে বাংলাদেশে); 

(👉) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া (১০দিনের রপ্তানি আয় মেটানোর মতো রিজার্ভ আছে।) ; 

(👉) ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাব (রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে।); 

(👉)প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক, চা ও রাবারে আয় কমে যাওয়া; 

(👉) খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, ভুল নীতি, ভুল প্রকল্প বাছাই; 

(👉) বাজেট ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১০ শতাংশে। ৫ শতাংশের বেশি হলেই তা বিপৎসংকেত বলে ধরা হয়; 

(👉) টাকা ছাপানোয় মূদ্রাস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ১৭.৫%;

✍️✍️✍️✍️

Berserk

।॥॥॥॥॥

"শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সংকটঃ কারণ,ভবিষ্যৎ ও সংকট মোকাবেলায় শ্রীলংকান সরকারের করণীয়"

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা চরম এক সংকটকাল অতিক্রম করছে। দেশটিতে এখন শুধু হাহাকার। জ্বালানী তেল এবং খাদ্য কেনার জন্য উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে সাধারণ মানুষ।১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কখনো এতোটা দুরাবস্থায় পড়েনি দেশটি।বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট বেসামাল করে তুলেছে দ্বীপরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে।

বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত শ্রীংলকা। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় ঠেকেছে যে তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারছে না। জিনিসপত্রের দাম এখন আকাশছোঁয়া।

কাগজের অভাবে দেশটির স্কুল পর্যায়ের পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। কারণ, কাগজ আমদানি করার মতো বৈদেশিক মুদ্রা তাদের কাছে নেই।জ্বালানী তেলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে দেশটিতে। তেল সংগ্রহের জন্য হাজার-হাজার মানুষ লাইনে ভিড় করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে দেশটির সরকার।কারণ, জ্বালানী তেল আমদানি করার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা নেই শ্রীলংকার কাছে।

শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সংকটের কারণঃ

১.অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পঃ

গত ১৫ বছরে শ্রীলংকা বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, রাস্তাসহ আরো নানা ধরণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

রাজধানী কলম্বোর কাছেই সমুদ্র থেকে ভূমি উদ্ধার করে কলম্বো পোর্ট সিটি নামে আরেকটি শহর তৈরি করা হচ্ছে।এসবের কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ২৫ বছর এবং বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। চীনের সাথে একত্রিত হয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে শ্রীলংকা।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে শ্রীলংকা ঋণ নিয়েছে। বিপুল অর্থ খরচ করা হলেও অনেক প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়নি। কিছু বড় বড় প্রকল্প শ্রীলংকার জন্য 'শ্বেতহস্তীতে' রূপান্তরিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর।

 গত ১৫ বছর ধরে শ্রীলংকায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ তেমন একটি হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগের পরিবর্তে বিভিন্ন সরকার ঋণ করার প্রতি মনোযোগী হয়েছে।গত এক দশকে চীনের কাছ থেকে শ্রীলংকা ঋণ নিয়েছে পাঁচ বিলিয়ন ডলার। এ ঋণ দিয়ে শ্রীলংকা বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করেছে। শ্রীলংকার মোট ঋণের ১০ শতাংশ চীন থেকে নেয়া।আবার, শ্রীলংকার মোট ঋণের ৪৭ শতাংশ বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন বন্ড ইস্যু করে নেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের অর্থ অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া যাচ্ছে না।চীন হচ্ছে শ্রীলংকার সবচেয়ে বড় ঋণদাতা। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মুদ্রা বাজার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং জাপানের কাছ থেকেও ঋণ নিয়েছে শ্রীলংকা।

২.ঋণের ভারে জর্জরিতঃ

শ্রীলংকার এ সমস্যা রাতারাতি তৈরি হয়নি। গত ১৫ বছর ধরে এ সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে দেদারছে ঋণ নিয়েছে শ্রীলংকার বিভিন্ন সরকার।

এর মধ্যে অন্যতম উৎস্য হচ্ছে সার্বভৌম বন্ড। ২০০৭ সাল থেকে দেশটির সরকার অর্থ জোগাড়ের জন্য সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে এ ধরণের সার্বভৈৗম বন্ড বিক্রি করা হয়। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে এ ধরণের বন্ড বিক্রি করে অর্থের জোগান দেয়া হয়। শ্রীলংকা সেটাই করেছে।

কিন্তু এই অর্থ কিভাবে পরিশোধ করা হবে সে ব্যাপারে খুব একটা চিন্তা-ভাবনা করেনি।ঋণ পরিশোধে বেহাল অবস্থা আন্তর্জাতিক সার্বভৈৗম বন্ড বাবদ শ্রীলংকার ঋন রয়েছে এখন সাড়ে বারো বিলিয়ন মার্কিন ডলার।এছাড়া দেশীয় উৎস থেকেও সরকার ঋণ করেছে।সব মিলিয়ে চলতি বছর শ্রীলংকাকে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে।এ সাত বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ (আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড) দেড় বিলিয়ন ডলার কিন্তু অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছর এসব ঋণ শোধ করতে পারবে না দেশটি।

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর মতে,গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড বাবদ যে ঋণ নেয়া হয়েছে সেখান থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে পাঁচশ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে শ্রীলংকা।

ফলে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। যে কারণে দেশটি জ্বালানী তেল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে পারছে না।

২০২১ সালে সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশটিতে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা জারী করেছেন। এর ফলে মৌলিক খাদ্যপণ্যের সরবরাহ এখন সরকার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ১৫ শতাংশ।

৩.কর কমানো

২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ক্ষমতাসীন হবার পরে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট দেশটিতে ভ্যাট এবং ট্যাক্স কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ ধরণের পদক্ষেপে অনেক বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।ভ্যাট প্রদানের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশে আনা হয়।ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর মূল কারণ ছিল অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা।

২০০৯ সালে শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধ শেষ হবার পরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে (বর্তমান প্রেসিডেন্টের ভাই) একই ধরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর ফলে তখন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অর্থনীতিতে গতি এসেছিল।সে আলোকেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসেও একই পদক্ষেপ নেন।কিন্তু এর কয়েকমাসের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারি শুর হয়। আয়কর এবং ভ্যাট কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে সরকার আরো ঋণ নিতে বাধ্য হয়। 

অন্যদিকে সরকারকে ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতাও মেনে চলতে হয়। সবমিলিয়ে প্রচন্ড চাপ তৈরি হয় অর্থনীতির উপর।

৪.পর্যটন ও রেমিট্যান্স খাতের বিপর্যয়ঃ

শ্রীলংকায় বৈদেশিক মুদ্রার বড় জোগান আসে দেশটির পর্যটন খাত থেকে। করোনাভাইরাস মাহারির কারণে প্রায় দুই বছর পর্যটন শিল্পে কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় চরম সংকটে পড়েছে দেশটি।

মহামারি শুরুর আগে শ্রীলংকায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসতো চীন থেকে। কিন্তু চীনে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ কঠোর থাকায় চীন থেকে পর্যটক আসতে পারেনি। এর ফলে দেশটির পর্যটন খাতে বিপর্যয় নেমে আসে।

দেশটিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেকটি বড় জায়গা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রীলংকার নাগরিকদের পাঠনো ডলার। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির সময় সেটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উল্লেখ যে, করোনাভাইরাস মহামারির আগে পর্যটন এবং রেমিটেন্স থেকে শ্রীলংকার ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করতো।

৫.অর্গানিক চাষে বিপর্যয়ঃ

২০১৯ সালে ক্ষমতাসীন হবার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশে অর্গানিক কৃষি চালু করেন। সেজন্য কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এর অংশ হিসেবে শ্রীলংকায় সার আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়।এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল কৃষিক্ষেত্রে। এতে চালের উৎপাদন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।একসময় চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্রীলংকা বাধ্য হয় ৪৫০মিলিয়ন ডলারের চাল আমদানি করতে। চালের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।অর্গানিক কৃষির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল দেশটির চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে। চা রপ্তানি করে শ্রীলংকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। সেখানেও বড় ধাক্কা লাগে।

কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে আনার জন্য সরকার ২০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। দেশজুড়ে একই সাথে খাদ্যঘাটতিও প্রকট আকার ধারণ করে। 

সংকট মোকাবেলায় শ্রীলংকাঃ

বর্তমান সংকট সামাল দিতে শ্রীলংকার প্রয়োজন বৈদেশিক মুদ্রা। সেজন্য অনেকের দ্বারস্থ হচ্ছে দেশটি।আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর সাথে আলোচনা করছে দেশটি। আইএমএফ-এর কাছ থেকে ঋণ পেতে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে দেশটি। বর্তমানে মার্কিন এক ডলারের বিপরীতে শ্রীলংকার ২৩০ রূপি।

এছাড়া চীন ও ভারতের কাছে আরো ঋণের আবেদন করেছে শ্রীলংকা।জরুরি কিছু খাদ্য, ঔষধ এবং জ্বালানী কেনার জন্য গত সপ্তাহে ভারত শ্রীলংকাকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে।

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত শ্রীলংকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আছে মাত্র ২.৫ বিলিয়ন ডলারের কম। গত দশ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন।

করণীয় কি?

√অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের মাধ্যমে বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে শ্রীলংকা। এজন্য দেশটির রপ্তানি বাড়াতে হবে।

√রপ্তানি বাড়াতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য আনা দরকার। এজন্য প্রয়োজন বৈদেশিক বিনিয়োগ। কারণ শ্রীলংকার ব্যবসা ছোট এবং তাদের পক্ষে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।

√মধ্যমেয়াদে দেশটির রাজস্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনা ভালো করার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ

বিবিসি 

প্রথম আলো

Comments

Popular posts from this blog

জিরো কুপন বন্ড কী? এইটা কিভাবে কাজ করে?

ব্যাংক ভাইবা - মোঃ ইউসুফ আলী

১ম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা-- আল-আমিন আহমেদ