আমার ৪০তম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা ও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল সোহেল রানা - পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত

আমার ৪০তম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা ও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল
সোহেল রানা
(পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ,মেধাক্রম -২১তম)
হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি
তারিখ:২৯-০৯-২০২১
বোর্ড: শ্রদ্ধেয় ডা: উত্তম কুমার সাহা
সিরিয়াল: ২/১৫
পছন্দ ক্রম: পুলিশ, এডমিন, ইকোনমিক, কাস্টমস, টাক্স, অডিট।
আমি ৩৮ তম বিসিএস এ শিক্ষা ক্যাডারে গেজেটেড হয়েও join করিনি। 
ডাবল মাস্ক পড়ে রুমে ঢুকে সালাম দিলাম। স্যার বসতে বললো। সাথে সাথেই বললো যে, কোন কলেজে আছি এখন। আমি বললাম যে, স্যার,আমি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানিতে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে আছি বিধায় শিক্ষা ক্যাডারে join করা হয় নাই। স্যার noc দেখে নিশ্চিত হলেন এবং অনেকটা ধমক দিয়ে বললেন যে, আপনি তো বিসিএস ক্যাডার কে রিফিউজ করেছেন। পাওয়ার সেক্টর দিয়ে একটা খাত উন্নতি হবে,আর শিক্ষা ক্যাডার দিয়ে আপনি একটা জাতিকে উন্নতি করতে পারতেন। আর ধমক দিয়ে বললেন যে, আপনি এখানে কি করেন যার জন্যে এমন মহান পেশাকে রিফিউজ করলেন?
আমি: স্যার,আমি অডিট ডিপার্টমেন্ট এ আছি যা আমার সাবজেক্টের সাথে মিল আছে যার কারণে আমি অনেক অনিয়ম আর ভুল ত্রুটি খুঁজে সেগুলা আপত্তি দিয়ে টাকা আদায় করি।
চেয়ারম্যান: এসব করার জন্যে CAG আছে।  আপনার প্রথম চয়েস কি ?
আমি: বিসিএস পুলিশ।
চেয়ারম্যানসহ বাকি দুইজন এক্সার্নাল কটাক্ষ করে হেসে দিল। আর বললো যে, একাউন্টিং এ পড়াশোনা করে শিক্ষা ক্যাডার বাদ দিলেন,আবার অডিট ক্যাডারকে সবার শেষে চোজ করে এখন আবার পুলিশ হতে চান? কি একটা অবস্থা আপনার। পুলিশ হয়ে কি করবেন? 
আমি: সবার প্রথমে আমি জনগণের সেবক হয়ে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এ জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে কাজ করবো স্যার। 
চেয়ারম্যান: জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা আপনার কাজ না। ধমক দিয়ে বলেন যে, এইসব কি আপনার কাজ? আপনি কি পলিসি মেকার? এসব উদ্ভট কথা বার্তা আমাদের কে বলবেন না।
তারপর আবার বললেন যে, ৩ নম্বর চয়েজ তো ইকোনমিক ক্যাডার। আচ্ছা, এটার হায়ারার্কি বলুন তো।
আমি : স্যার, যেহেতু এটা এডমিনের সাথে একীভূত হয়ে গেছে তাই....
চেয়ারম্যান: আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন যে, যখন চয়েস দিয়েছেন তখন তো একীভূত হয় নাই, ঐটারই হায়ারার্কি বলুন।
আমি: সরি স্যার।
চেয়ারম্যান: আপনি সিউর?
আমি: আমি এই মুহূর্তে হায়ারার্কিটা মনে করতে পারছি না।
চেয়ারম্যান স্যার উনার ডান পাশের এক্সটার্নাল স্যারকে প্রশ্ন করতে বললেন ।
এক্সটার্নাল-১ : কিছুদিন আগে একটা গ্রাম খুব জনপ্রিয় ছিল, নাম কি ঐ জায়গা টার?
আমি: আমি ভয়ে কিছুই মনে করতে পারছিলাম না। বললাম যে, আসলে একটা গ্রাম তো অনেক দিক দিয়েই জনপ্রিয় হয়ে থাকতে পারে, তবে আপনি কোনদিন দিয়ে বলছেন তা আমি বুঝতে পারছি না স্যার। 
এক্সটার্নাল-১: আচ্ছা, তুমি কি চর কুকুরি মুকরি এর নাম শুনেছ?
আমি: জি স্যার, শুনেছি।
এক্সটার্নাল-১: এটা কেন জনপ্রিয়?
আমি: স্যার, এখানে সর্বপ্রথম UDC বা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার চালু করা হয়।
এক্সটার্নাল-১: এই যে তুমি পেরেছ। কি কি সেবা দেওয়া হয় এখানে?
আমি: কয়েকটা সেবার নাম বললাম। 
এক্সটার্নাল-১:স্যার খুশি হলেন। বললেন, তোমার কি ইউনিয়ন? গিয়েছ কখনো? পরে স্যার আমার জেলা দেখলেন।
আমি: বললাম যে, আমি প্রায় সেখানে যাই স্যার।
এক্সটার্নাল-১: স্যার আমার হোম ডিস্ট্রিক্ট ঢাকা দেখে বললেন যে, তোমার বাবা কি করে?
আমি : আমাদের নিজস্ব জমি জমাতে ফসল ফলিয়ে কৃষি কাজ করেন।
এক্সটার্নাল-১: স্যার,হেসে বললেন, ঢাকার কেরানীগঞ্জ এ কোনো কৃষি জমি আছে নাকি? সবই তো শহর।
আমি: আমি বললাম যে, আমার বাড়ি নদীর পাশে ,কিছুটা গ্রামের দিকে। সেখানে কৃষি প্রধান পেশা।
এক্সটার্নাল-১: কি কি ফসল হয়?
আমি: আমি এক্সাক্ট উত্তর না দিয়ে অনেকটা পেঁচিয়ে বলে ফেলেছি। পরে চেয়ারম্যান স্যার বললেন যে, এক্সাক্টলী বলুন।
আমি: স্যার, ধান, লাউ, পুই শাক, টমেটো, বেগুন ইত্যাদি।
এক্সটার্নাল-১: কতুটুকু জমি আছে তোমাদের?
আমি: স্যার, দেড় থেকে দুই পাখির মতো।
এক্সটার্নাল-১: ওহ, তুমি পাখিও বুঝো? এক পাখিতে কত শতাংশ?
আমি: স্যার, এটা সাধারণত এক এক এলাকায় এক এক রকম হয়,আমাদের এখানে ২৬ শতাংশ কে এক পাখি বলে।
এবার স্যার দ্বিতীয় এক্সটার্নাল কে প্রশ্ন করতে বললেন। উনি অনেকটা রিজার্ভড স্বভাবের মনে হয়। আর কমার্স ব্যাক গ্রাউন্ডের মনে হল।
এক্সটার্নাল-২: পুলিশে কেন আসতে চাও? কি যোগ্যতা আছে তোমার? 
আমি: স্যার,আমি যেহেতু গ্রামে বড় হয়েছি। গ্রামের মুক্ত পরিবেশে বড় হয়ে নিজের ভিতর সাহস জুগিয়েছি। তাছাড়া আমি দুই বছর ধরে অডিট ডিপার্টমেন্ট এ আছি, যাকে বলা হয় "ইনফরমাল পুলিশিং এক্টিভিটিস".
এক্সটার্নাল-২: এই সাহস সবারই আছে।
আমি: স্যার,আমার কাছে জন্মগত সাহস আছে,যা কাউকে ট্রেনিং দিয়েও আমার সমকক্ষ করতে পারবেন না।
এক্সটার্নাল-২: ABC কস্টিং কি?
আমি: আমি বাংলায় উত্তর করলাম। চালাকি করে cost driver শব্দটি উল্লেখ করেছি।
এক্সটার্নাল-২:  cost driver কি?
আমি: আবারও ভুলে বাংলায় উত্তর করেছি।
এক্সটার্নাল-২: cost pool কি?
আমি: অনেকটা পেঁচিয়ে ফেলি।
এক্সটার্নাল-২:  আন্তাজেই বইলেন না সব।
এক্সটার্নাল-২: ফরেনসিক একাউন্টিং কি?
আমি : বাংলা ইংলিশ এ উত্তর করলাম।
এক্সটার্নাল-২: পোস্ট মর্টেম কি?
আমি: উত্তর করলাম। মর্গের কথা বললাম।
এক্সটার্নাল-২: পোস্ট মর্টেম এর সময় সেখানে কে উপস্থিত থাকে?
আমি: সিভিল সার্জন। জেলার স্বাস্থ্য প্রধান।
এক্সটার্নাল-২: পোস্ট মর্টেম এ কি কি করে?
আমি: একটু ডিটেইলস বললাম। 
এক্সটার্নাল-২: তাইলে এটা কি অটোপসি নাকি বায়োপসি? 
আমি: স্যার,এটা যেহেতু পোস্ট মর্টেম,তাই অটোপসী হবে।(আন্টাজেই বলেছি)
এক্সটার্নাল-২: আপনি না জেনে বলেন কেনো? 
আমি : সরি স্যার।
চেয়ারম্যান স্যার এবার বললেন যে, আপনি এবার আসতে পারেন। সার্টিফিকেট নিয়ে যান। 
আমি শিক্ষায় join করেনি বলে স্যার অনেক ধমক দিয়েছে। তাই সার্টিফিকেট আনার সময় বললাম যে, স্যার, আমি যেখানেই থাকি না কেন, আমার জন্যে দোয়া করবেন,যাতে আমি মানুষের সেবা করতে পারি,কারণ মানুষের সেবা করার মতো তৃপ্তি আর কোথাও নাই।
স্যার চেঁচিয়ে বললেন যে, খবরদার এসব বলবেন না।আমরা সবার জন্যেই দোয়া করি। আমরা এগুলা নেগেটিভলি নেই।
শুরুর দিকে আমি একদম ভীত সন্ত্রস্ত ছিলাম আর পুরো বোর্ড নেগেটিভ ছিল। মনে হচ্ছিল যে, আমাকে বুঝি বের করে দিবে। স্যাররা বার বার আমার হাতের দিকে তাকাচ্ছিল। আমার নার্ভাসনেস দেখতেছিল।
আল্লাহর রহমতে ও স্যারদের বিচক্ষণতায় আমি আমার পছন্দের প্রথম ক্যাডার পাই। আমি শিক্ষা ক্যাডার এ join না করে আসলেই ভুল করেছি, যা অন্য কোনো বোর্ড থাকলে হয়তো আমাকে ফেল করিয়ে দিত। 
আর শেষে এইভাবে স্যারদের কাছে দোয়া চাওয়া ঠিক হয় নাই। অনেকেই নেগেটিভলি নিতে পারে। দোয়া করবেন আমার পেশগত জীবনের জন্যে।

Comments

Popular posts from this blog

জিরো কুপন বন্ড কী? এইটা কিভাবে কাজ করে?

ব্যাংক ভাইবা - মোঃ ইউসুফ আলী

১ম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা-- আল-আমিন আহমেদ