সিআইপিএস কি পারবে সুইফটের স্থান নিতে? ড. লিপন মুস্তাফিজ |দেশ রুপান্তর। ১০ মার্চ, ২০২২
ব্যাংকিং খাতে ‘সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ‘সুইফট’, যা আর্থিক লেনদেনের জন্য বহুল প্রচলিত একটা মাধ্যম হিসেবে সারা বিশ্বে ব্যবহৃত হয়। এই নেটওয়ার্ক দ্রুত আর্থিক লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদানের জন্য অত্যন্ত সুরক্ষিত একটা মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। এটাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম, যা অতিদ্রুত ব্যাংকগুলোর বড় বড় আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করে থাকে। ১৯৭০ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলা হয় যে, সুইফট হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার মেরুদন্ড। প্রতিবছর এই মাধ্যম ব্যবহার করে কয়েক ট্রিলিয়ন অর্থ লেনদেন হয়।
তবে আর্থিক লেনদেনের জন্য রাশিয়া ও চীন নিজস্ব ব্যবস্থা ব্যবহার করে, যা অনেকটাই সুইফটের মতো। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের ফলে সামনে প্রশ্ন আসে, যদি রাশিয়ার ব্যাংকগুলোকে সুইফট নেটওয়ার্ক বন্ধ বা নিষিদ্ধ করে তাহলে কী হবে? সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে প্রবেশ করতে বেগ পেতে হবে। রাশিয়ার ব্যবসায়ীদের পক্ষে আমদানি, রপ্তানি, ঋণ দেওয়া বা নেওয়া অথবা বিদেশে বিনিয়োগে অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
উল্লেখ্য, যে ৩০০ রুশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে লেনদেনের জন্য সুইফট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। বিবিসির সূত্র ধরে জানা যায়, জার্মান সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, রাশিয়ান এসব ব্যাংকে বৈদেশিক লেনদেন বন্ধ করতে এই উদ্যোগ। আবার যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, এই ব্যাংকগুলোর পরিচালনার ক্ষমতা হ্রাস করাও ইউরোপীয় কমিশনের উদ্দেশ্য। পাশাপাশি যুদ্ধকালীন অর্থভা-ার যাতে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্যও পশ্চিমা দেশগুলো কাজ করে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, ডলার আর সুইফটের আধিপত্য কমতে শুরু করেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রার কারণে পশ্চিমা দেশের আর্থিক ব্যবস্থা পাশ কাটানোর সুযোগ আছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপানসহ একাধিক দেশ ইউক্রেন সংকটের জেরে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বেশ কটি রাশিয়ান সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পপতির সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা হয়েছে। এমনকি কয়েকটি দেশ রুশ পর্যটকদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
কিন্তু তাতে প্রাথমিকভাবে কিছুটা অসুবিধায় পড়লেও বিটকয়েনকে হাতিয়ার করে রাশিয়ার নাগরিকদের অনেকেই সেই নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সক্ষম হবেন বলে মনে করছে ডিজিটাল মুদ্রা বিশারদের একাংশ। আবার এই সুযোগে চীনা লেনদেনব্যবস্থা ‘ক্রস বর্ডার ইন্টার ব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম’ বা ‘সিআইপিএস’ এবং তাদের ডিজিটাল ইয়েন বিকল্প মুদ্রা হয়ে উঠতে পারে এমন সম্ভাবনাও প্রবল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই নতুন করে আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে রাশিয়া। সে দেশের ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পপতি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে বিধিনিষেধ জারি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই রাশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে রাশিয়া বিটকয়েনকে ব্যবহার করে সেই নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সক্ষম হবে বলে অনেকে মনে করছেন। কেননা ডিজিটাল মুদ্রা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এরই মধ্যে রাশিয়ার নাগরিকদের মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে। ভবিষ্যতের ঝুঁকি এড়াতেই তারা বিটকয়েনের ওপর নির্ভর করা শুরু করছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রও এ সমস্যা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। কয়েক মাস আগে সেই দেশের অর্থ দপ্তরের এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছিল, ডিজিটাল মুদ্রা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা হ্রাস করছে। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে প্রথাগত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে তহবিল সঞ্চয় ও স্থানান্তর করতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছিল ওই সতর্কবার্তায়।
সুইফটের সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে, কিন্তু এর তথ্যভান্ডার যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায়। ফলে অন্য দেশের আর্থিক লেনদেনে নজরের সুযোগ থাকে। সুইফটের পাশাপাশি তাদের হাতে থাকে ডলার ও চিপস-ক্লিয়ারিং হাউজ ইন্টার ব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম। এটি বিশ্বের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক ক্লাবের মতো, যার সদস্য সংখ্যা ৪৩। এর মাধ্যমে লেনদেন করতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভে হিসাব খুলে আগে থেকে অর্থ রাখতে হয়। চিপসের মাধ্যমে দিনে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার লেনদেন হয়। এর সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে কার্যালয় খুলতে হয়। আর সবকিছু পরিচালিত হয় মার্কিন আইন অনুসারে। ফলে তারা যখন-তখন যাকে-তাকে ধরতে পারে বা পরিপালনের সুযোগ আছে। ফলে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও যারা তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন করেছে, তাদের কাছ থেকে গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার জরিমানা আদায় করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই চিপসের ব্যবহার চীনের নজরে আসে। এর জন্য চীন ‘ক্রস বর্ডার ইন্টার ব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম’ বা ‘সিআইপিএস’ গড়ে তুলেছে। এখন রাশিয়ার ব্যাংকগুলোও ‘সিআইপিএস’কে সুইফট ও চিপসের বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে ভাবছে। সিআইপিএসের গুরুত্ব বৃদ্ধির ঘটনায় ধারণা করা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার রুবলের চেয়ে চীনের মুদ্রা ইউয়ানের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। তবে সুইফটের বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য স্থান দখল করতে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে সিআইপিএসকে।
খেয়াল করা দরকার, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে চীনের মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার ২ শতাংশের কম, মার্কিন ডলারের ব্যবহার ৪০ শতাংশ। এমনকি ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড কিংবা জাপানি মুদ্রা ইয়েনের তুলনায়ও পিছিয়ে আছে ইয়েন। তবে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, কম ব্যবহার সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সুইফটের আঞ্চলিক বিকল্প হয়ে উঠতে পারে সিআইপিএস। যেমন ইউরেশিয়া অঞ্চলে এর একক ব্যবহার শুরু হতে পারে। সম্প্রতি রাশিয়ার ২৩টি ব্যাংক সিআইপিএস ব্যবস্থায় যোগ দিয়েছে, বিপরীতে কেবল ব্যাংক অব চায়না রাশিয়ার এসপিএফএস ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। ফলে সিআইপিএসের ওপর রাশিয়ার নির্ভরতা বাড়ছে। তাই বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সুইফটের বিকল্প হতে চীন কি রাশিয়ার এসপিএফএসকে সঙ্গে নিয়ে এগোবে, নাকি নিজেরাই এককভাবে সিআইপিএসের প্রসার ঘটাতে চাইবে।
অন্যদিকে, আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি, বিশ্বের ২০০ দেশের ১১ হাজার ব্যাংকে তথ্য যাচাইয়ের কাজও করে থাকে সুইফট। তার মধ্যে বেশির ভাগই সেসব দেশের কেন্দ্রীয় বা প্রধান সরকারি ব্যাংক। আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাবি, সুইফট থেকে বাদ পড়লে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর আর্থিক লেনদেন টেলিফোন এবং ফ্যাক্স মেশিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। বর্তমান বিশ্ব থেকে কয়েক গুণ পিছিয়ে যাবে রাশিয়ার আর্থিক ব্যবস্থাপনা।
২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ করলে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আবেদন জানায়, রাশিয়ার বিরুদ্ধে এমন কিছু করা যায় কি না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে তাকে সারিয়ে দেওয়া যায় কি না। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আলেক্সেই কুদরিন বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো তখন সেই পথে হাঁটেনি। কিন্তু রাশিয়া এবার ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করায় পশ্চিমা দেশগুলো আর বসে থাকেনি। কারণ, তৎকালীন রুশ প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছিলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। রাশিয়ার কিছু ব্যাংক এবার সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ক্ষতি হবে তা নিশ্চিত।
কিন্তু যারা রাশিয়াকে এই আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করল, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, তারাও এতে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ, রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সুইফট ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির ব্যাংকগুলো।
অন্যদিকে রাশিয়া আর্থিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে ২০২০ সাল থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ডিজিটাল মুদ্রার প্রচলন করেছে। এতে ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। তবে রাশিয়ার বাইরে অর্থ প্রদানের মাধ্যম হিসেবে ডিজিটাল রুবলকে সবাই হয়তো সহজে গ্রহণ করবে না। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেশ কিংবা তুরস্কের মতো ভারসাম্য রক্ষাকারী দেশে এর ব্যবহার হতে পারে। আবার ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটানো হয়তো সম্ভব হবে না রাশিয়ার পক্ষে। কারণ, ২০১৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় ডিজিটাল মুদ্রায় লেনদেনও যুক্ত করেছে।
আবার সুইফটে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) মানতে চায় না। ইরানের ওপর সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ইইউর অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নাখোশ হয়েছিল। সে সময় সুইফটের বিকল্প হিসেবে ইইউ ইনস্ট্রুমেন্ট ফর সাপোর্টিং ট্রেড এক্সচেঞ্জেস (ইনসটেক্স) চালু করে। ইইউ ভবিষ্যতে ইনসটেক্সের কার্যকারিতা উন্নত করার পরিকল্পনা করছে। রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো এরই মধ্যে এতে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি তারা ভিসা ও মাস্টার কার্ডের মতো পেমেন্ট কার্ডের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে। তাই সুইফটের বিপরীতে ইইউর এই প্রচেষ্টা রাশিয়া ও চীনকে বিকল্প তৈরিতে সাহায্য করবে।
রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় পুতিন অনেক দিন ধরে পরিকল্পনা করছিলেন। অনেক বিশ্লেষক অবশ্য মনে করেন, এই নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে তেমন একটা বিপদে ফেলতে পারবে না। তবে সুইফট থেকে বাদ পড়া নিঃসন্দেহে বড় ঘটনা। হয়তো পুতিন সেটা প্রত্যাশা করেননি। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শুধু রাশিয়া নয়, পুরো পৃথিবীর অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করবে। তবে, সুইফট নাকি চীনের তৈরি সিআইপিএস আগামী দিনের আন্তর্জাতিক লেনদেন বাজার দখল করবে সেটা বলার সময় এখনো আসেনি।
লেখক ব্যাংকার ও গবেষক
liplisa7@gmail.com
Comments
Post a Comment