ইজরায়েল - তুরস্কের নতুন করে মধুর সম্পর্কে মেতে উঠার জটিল ভূরাজনীতি!

প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে ইজর।য়েলকে স্বীকৃতি দানের পাশাপাশি মুসলিম কোনো দেশের পার্লামেন্টে প্রথমবারের মতো ইজর।য়েলের প্রেসিডেন্টকে বক্তব্য দানের সুযোগ প্রদানকারী দেশটি হলো তুরস্ক। জায়নবাদী ইজর।য়েল রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে তুরস্কের সাথে দেশটির সম্পর্ক বরাবরই মধুর হলেও বিগত এক দশক ধরে দেশ দুইটির সম্পর্ক একদম তলানিতে ছিলো।
বিশেষ করে ২০১০ সালে গ।জ। উপকূলে অবরুদ্ধ গ।জ।বাসীর জন্য তুরস্ক কর্তৃক প্রেরিত ত্রাণবাহী জাহাজ "মাভি মারমারা"-তে ইজর।য়েলের হামলায় নয়জন তুর্কী নাগরিক নিহত (পরবর্তীতে আরো একজন মারা যান) হওয়ার পর থেকে দেশ দুইটির সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নেয়। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ফি লিস্তিনিদের পক্ষে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তুরস্কের উচ্চস্বর এবং হ।ম।স নেতাদের তুরস্কে আশ্রয়দানের মাধ্যমে ইজর।য়েলের চক্ষুশূলে পরিণত হয় তুরস্ক। দেশ দুইটির এমন অহি - নকুল সম্পর্কের কারণে বেশিরভাগ বিশ্লেষকই মনে করতো, নিকট ভবিষ্যতে এই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আর গড়ে উঠবে না। (অবশ্য এত এত সংকটের মাঝেও দেশ দুইটির মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক কমার বদলে উল্টো সবসময় বেড়েছে।) 
কিন্তু সব সমীকরণ এবং হিসাব নিকেশ পাল্টিয়ে হঠাৎ করেই দেশ দুইটির সম্পর্ক আবারো দৃঢ় হতে চলেছে। ২০০৯ সালের পর ২০২২ সালে এসে প্রথমবারের মতো দেশ দুইটির পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার তুরস্ক সফরে এসেছেন ইজর।য়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারগোজ ( সময়কাল ২০২২ সালের ৯-১০ মার্চ)। ২০০৭ সালের শিমেন পেরেজের সফরের প্রায় ১৫ বছর পর প্রথম কোনো ইজর।য়েলী প্রেসিডেন্টের তুরস্ক সফর এটি।
কিন্তু কি এমন হলো, যাতে সাম্প্রতিককালে চরম শত্রুতায় মগ্ন দেশ দুইটির সম্পর্ক আবারো বন্ধুত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে? 
১…
ভূমধ্যসাগরের সমুদ্র সীমা সংক্রান্ত বিরোধ!
ভূমধ্যসাগরকে পূর্ব এবং পশ্চিম দুইভাগে বিভক্ত করা যায়। তন্মধ্যে পূর্ব ভূমধ্যসাগরেরর দেশগুলোর মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত তীব্র বিরোধ বজায় রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। ইজর।য়েল এবং তুরস্ক এই দুইটি দেশই পূর্ব ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত।  
তুরস্ক এবং ইজর।য়েল ছাড়াও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের অন্যান্য দেশগুলো হলোঃ সিরিয়া, লেবানন, ফি লিস্তিন (গ।জ।), মিশর, লিবিয়া, সাইপ্রাস, তুর্কী সাইপ্রাস এবং গ্রিস। 
এই দেশগুলো সমুদ্র সীমা সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে দুইটি ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলো গত এক দশক ধরে। নিজেদের মধ্যে পারষ্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটা ব্লক তৈরি করে গ্রীস, মিসর, সাইপ্রাস এবং ইজর।য়েল পরষ্পরের মধ্যে এমনভাবে সমুদ্র সীমা চুক্তি করেছে যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের অংশে তেমন কোনো সমুদ্র সীমা পড়েনি বললেই চলে। বিপরীত পক্ষকে ঘায়েল করতে তুরস্ক তাই লিবিয়া এবং তুর্কী সাইপ্রাসকে সাথে নিয়ে নিজেদের অনুকূলে আরেকটি সমুদ্র সীমা নির্ধারণ করেছে।
বলা বাহুল্য এই দুই ব্লকের কেউই অন্য পক্ষের প্রস্তাবকৃত সীমাকে পুরাপুরি মেনে নেয়নি। ফলে সমুদ্র সীমা নির্ধারণ নিয়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অচলাবস্থা বিরাজ করছে গত কয়েক বছর ধরেই। 
২…
সমুদ্র সীমা সংক্রান্ত বিরোধের নতুন রসদ - ভূমধ্যসাগরে বিপুল গ্যাস প্রাপ্তি! 
মাত্র দুইশ বছর আগেও এই পূর্ব ভূমধ্যসাগর বিবেচিত হতো তুর্কী লেক হিসেবে। কারণ পূর্ব ভূমধ্যসাগর পাড়ের সবগুলো দেশই ছিলো তৎকালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে। কিন্তু উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে এসে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উত্তর অংশ বাদে আর পুরোটাই হারাতে হয় তুরস্ককে। এককালের তুর্কী লেক ভূমধ্যসাগর হয়ে উঠে তুরস্কের জন্য এক কণ্টকাকীর্ণ জলপথ!
এককালের তুর্কী লেক ভূমধ্যসাগরে বর্তমানে তুরস্কের কৌশলগত অবস্থান অনেকটা নাজুক পর্যায়ে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুরস্কের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা পারষ্পরিক ঐক্য তুরস্ককে অনেকটা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিলো। 
সীমানা নির্ধারণ ছাড়াও ভূমধ্যসাগরের দেশগুলোর আরেকটি বড় প্রেস্টিজের ইস্যু হলো গ্যাস! তুরস্ক ছাড়া মোটামুটি বাকি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর সবাই নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছে। ভূমধ্যসাগরে গত এক দশকের মধ্যে ইজর।য়েল, মিশর এবং সাইপ্রাস উপকূলে বিপুল গ্যাসের সন্ধান আবিষ্কৃত হয়েছে। আবিষ্কৃত এই গ্যাস দেশগুলোর নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বাইরের দেশেও রপ্তানি করার সক্ষমতা রাখে। আর এই গ্যাসই ভূমধ্যসাগরের জটিল রাজনীতিকে করেছে আরো জটিলতর।
কেননা গ্যাস উত্তোলনের জটিল ইস্যু ছাড়াও আরো বহু জটিল রাজনীতি হলো গ্যাস রপ্তানি করার প্রক্রিয়াটা। ভূমধ্যসাগরের বিপুল এই গ্যাসের প্রধান কাস্টমার হতে যাচ্ছে ইউরোপ। ফলে ইউরোপের রাজনৈতিক পলিসির স্বীকার হতে যাচ্ছে ভূমধ্যসাগরীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো।
এই গ্যাস নিয়ে কি কারণে দ্বন্দ্বের মুখে পড়ছে ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলি তা বুঝার জন্য আগে জানতে হবে তেল গ্যাস নিয়ে ইউরোপের পুরানো রাজনীতিকে।
৩…
ইউরোপে জ্বালানি সম্পদের রাজনীতি!
ইউরোপের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭৫% -ই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো থেকে আমদানিকৃত। ভৌগোলিকভাবে কাছে হওয়ায় পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপের চাহিদার প্রায় ৪৩% গ্যাসের যোগান আসে রাশিয়া থেকে। 
২০১৪ সালে ক্রিমিয়া নিয়ে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্য সংঘাত সৃষ্টি হয়।
ফলশ্রুতিতে রাশিয়া থেকে (ইউক্রেনের মধ্য দিয়ে) ইউরোপগামী গ্যাস পাইপলাইনটি ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। ফলে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বিপাকে পড়ে রাশিয়া। 
কিন্তু পরবর্তীতে রাশিয়া নতুন ২ টি পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে তার সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। প্রথমটি হলো কৃষ্ণ সাগরের তলদেশ দিয়ে তুরস্কের মধ্য দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের ৯০০ কি.মি. দীর্ঘ তুর্ক-স্ট্রিম পাইপলাইন। অন্যটি হল, বাল্টিক সাগরের নিচ দিয়ে জার্মানি হয়ে ইউরোপে প্রবেশের নর্ড-স্ট্রিম নামক পাইপলাইন।
গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে পারার সৌজন্যে রুশরা সবসময়ই তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে পারছে ইউরোপীয় দেশগুলোর উপর। সাম্প্রতিক ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধেও এই গ্যাসের কারণে রাশিয়ার উপর সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করা পুরোপুরি সম্ভবপর হবে না ইউরোপের পক্ষে। 
রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে যদি ইউরোপ  তার মিত্র আমেরিকা থেকে এলএনজি হিসেবে গ্যাস আমদানি করতে যায়, তাহলে ইউরোপের আমদানি ব্যয় বহুগুণে বেড়ে যাবে। কারণ একে তো আটলান্টিক পাড়ি দিতে হবে, উপরন্তু প্রাকৃতিক গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তরের খরচ অনেক বেশি। অর্থাৎ ইউরোপের জন্য রাশিয়ার গ্যাসের কার্যকর বিকল্প উৎস এখন পর্যন্ত নেই বললেই চলে।
৪…
ইউরোপীয় জ্বালানী চাহিদার কিং মেকার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে ভূমধ্যসাগর!
আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ চাচ্ছে, ইউরোপ যেনো নতুন কোনো উৎস থেকে গ্যাস আমদানি করার মাধ্যমে রাশিয়ার উপর তার নির্ভরশীলতা কমাতে সক্ষম হয়। আর এলক্ষ্যে ইউরোপ বিকল্প একাধিক প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। আর এই বিকল্প প্রজেক্টগুলোর মধ্যে টপ প্রায়োরিটির প্রজেক্ট হলো ভূমধ্যসাগরে আবিষ্কৃত গ্যাসকে ইউরোপের বাজারে নিয়ে আনা!
২০০৯ সালে ইজর।য়েল তার ইতিহাসের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র 'Tamar' আবিষ্কার করে যার মজুত প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। ২০১০ সালে  ইজর।য়েলে 'Leviathan' নামক গ্যাসফিল্ড আবিষ্কৃত হয়। এটির মজুতের পরিমাণ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। উপরিউক্ত ৮০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পরিমাণ গ্যাসের মজুদ নিশ্চিত হওয়া গেছে এখন পর্যন্ত, উপরন্তু ধারণা করা হচ্ছে এই মজুদের আরো কয়েকগুণ বেশি গ্যাস এখন পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত রয়েছে। 
এদিকে ২০১১ সালে সাইপ্রাসের সমুদ্রসীমায় আবিষ্কৃত হয় 'Aphrodite' গ্যাসক্ষেত্র। আর ২০১৫ সালে মিসরে আবিষ্কৃত হয় ৮৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার মজুতবিশিষ্ট 'Al zohr' গ্যাস-ফিল্ড যা ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে বড় গ্যাস ফিল্ড! 
ইউরোপের দোরগোড়ায় আবিষ্কৃত এই গ্যাসক্ষেত্রগুলো ঘরোয়া চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপে রপ্তানির জন্য যথেষ্ট। আর তাই ইউরোপের লক্ষ্য হলো রাশিয়ার উপর নির্ভরশীলতা কমানোর নিমিত্তে ভূমধ্যসাগরের গ্যাসকে ইউরোপের বাজারে নিয়ে আনা। 
৫…
গ্যাস আমদানির জন্য দরকার পাইপলাইন! সংকটের সূচনা একে ঘিরেই।
পাইপলাইন এবং তরলীকৃত গ্যাস  (এলএনজি) এই দুই উপায়ে গ্যাস একদেশ থেকে আরেকদেশে আনা নেওয়া করা হয়। এলএনজির খরচ বেশি হওয়ায় পাইপলাইনের মাধ্যমেই (সুযোগ থাকা সাপেক্ষে) বিভিন্ন দেশ গ্যাসের আমদানি - রপ্তানি বজায় রাখতে চায়।
আর এই পাইপলাইন ভিত্তিক রাজনীতি নিয়েই সরগরম হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতি! একদিকে গ্যাস পাইপলাইন হয়ে উঠেছে বিশ্বের শীর্ষ দুই পরাশক্তির আধিপত্য বিস্তারের চারণভূমি। ( রাশিয়া পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে তার গ্যাসের বাজার ধরে রাখতে মরিয়া আর অন্যদিকে আমেরিকা রাশিয়ার 'গ্যাস' নির্ভরশীলতা থেকে ইউরোপকে মুক্ত করতে সদা সচেষ্ট।) 
অপরদিকে ভূমধ্যসাগরের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার শ্রেষ্ঠ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পাইপলাইন প্রকল্পটি। আঞ্চলিক শক্তিধর রাষ্ট্র তুরস্ক চায় ইউরোপগামী সকল পাইপলাইনের মধ্যমণি হয়ে ইউরোপের এনার্জি-হাব হয়ে উঠতে, আবার ভূমধ্যসাগরীয় বেশকিছু দেশ চায় তুরস্ককে এড়িয়ে পাইপলাইন নির্মাণ করে এই অঞ্চলে তুর্কী প্রভাব ক্ষুণ্ণ করতে। 
৬…
তুরস্ককে বাইপাস করে ডিজাইনকৃত  "ইস্টমেড গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি-২০২০"! একসময়কার সাড়া জাগানো এই পাইপলাইন প্রকল্পটি কিভাবে পরিত্যক্ত হলো?
ইউরোপ গ্যাসের জন্য বরাবরই রাশিয়ার মুখাপেক্ষী, আর সরবরাহ রুটের জন্য অর্থাৎ পাইপলাইন গমনের জন্য তুরস্কের মুখাপেক্ষী। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্যাস আবিষ্কার ইউরোপকে রাশিয়া এবং তুরস্কের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিলো একটা সময়।
আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ ছিলো, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প। ২০০০ কি.মি. দীর্ঘ এই পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ বিলিয়ন ডলার। এই পাইপলাইনের রুট হল, ইসরায়েল - সাইপ্রাস - ক্রিট দ্বীপ(গ্রীস) - গ্রীস (মূল ভূখণ্ড) - ইতালি। 
কিন্তু তুরস্ক শুরু থেকেই এই চুক্তির ঘোরতর বিরোধী। কারণ প্রথমত এই পাইপলাইনে তুরস্ককে ইচ্ছেকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তুরস্কের দাবিকৃত সমুদ্র সীমা অঞ্চলকে সাইপ্রাসের ভূখণ্ডের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে পাইপলাইন স্থাপনের ডিজাইন করা হয়েছে। তুরস্কের সার্বভৌমত্ব বিরোধী (তুরস্কের মতে) এই প্রকল্প রুখতে দেশটি সবসময়ই তৎপর ছিলো।
কিন্তু বিগত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ইস্টমেইড পাইপলাইন প্রকল্পে দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করার পাশাপাশি ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের শক্তিশালী মিত্র না থাকায় একসময় মনে হচ্ছিলো, তুরস্ককে বাইপাস করে এই পাইপলাইন প্রকল্পটি হয়তো বাস্তবায়ন হয়েই যাবে।
কিন্তু ইউক্রেন - রাশিয়ার নতুন সংকটের কারণে এই অঞ্চলে ভূ রাজনীতির নতুন সমীকরণ সংঘটিত হতে যাচ্ছে। এর ফলে ইস্টমেইড পাইপলাইন প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নতুন দিকে মোড় নিয়েছে।
৭…
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটার্ন! কপাল খুললো তুরস্কের। 
রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যকার সংকটে আমেরিকা স্বাভাবিকভাবেই ইউক্রেনের পক্ষে লড়াই করছে। তার এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় সঙ্গী হওয়ার দাবিদার তুরস্ক। আর তাই তুরস্কের সমর্থন পেতে আমেরিকা তার এতদিনের সমর্থিত ইস্টমেইড পাইপলাইন প্রকল্প থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। 
যদিও প্রকাশ্যে আমেরিকা তুরস্কের প্রতি সমর্থনের কথা বলেনি। আমেরিকান প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত কারণে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের পাইপলাইন স্থাপনের প্রকল্পে তারা আর সমর্থন দিবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের পক্ষে সমর্থন জোগাতেই মূলত তুরস্কের স্বার্থ বিরোধী ইস্টমেইড পাইপলাইন প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
তা যে কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সমর্থন প্রত্যাহার করুক না কেনো, তুরস্কের জন্য এই সিদ্ধান্তটি পজেটিভ হিসেবেই এসেছে। কারণ আমেরিকার সমর্থন ব্যাতীত তুরস্ককে বাইপাস করে এই পাইপলাইন স্থাপনের হিম্মত ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর নেই।
কিন্তু পাইপলাইন স্থাপন না হলে ইজর।য়েলের আবিষ্কৃত বিপুল গ্যাসের কি হবে? ইউরোপের বাজারে ইজরা।য়েলের গ্যাস প্রবেশ করবে কিভাবে?
ইজর।য়েলকে এমন দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসতে চাচ্ছে তুরস্ক। তুরস্ক প্রস্তাব করেছে, তুর্কী ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে খুব সহজেই ইজর।য়েল তার গ্যাস ইউরোপে পাঠাতে পারবে।
তুরস্কের এমন প্রস্তাব অনেকটা সাদরেই গ্রহণ করতে চলেছে ইজর।য়েল। আর এরই ধারাবাহিকতায় প্রায় দেড় দশক পর কোনো ইজর।য়েলী প্রেসিডেন্ট তুরস্কে ভ্রমণ করতে যাচ্ছে। 
৮…
তুরস্ক - ইজর।য়েল গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প কি আদৌ সফল হতে পারবে?
★ সম্ভাবনা! 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইজর।য়েলের পরামর্শেই ইস্ট মেড পাইপলাইন প্রকল্পটি পরিবেশের দোহাই দিয়ে বাতিল করেছে। কারণ ইজর।য়েল বুঝতে পেরেছে, তুরস্ককে বাইপাস করে ইস্ট মেড পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব না। আবার এদিকে নিজে গিয়ে যদি এই প্রকল্প বাদ দিয়ে তুরস্কের প্রস্তাবকৃত প্রকল্পটি গ্রহণ করে ইজর।য়েল তবে তা দেশটির জন্য ইমেজ সংকটের কারণ হবে। 
আর তাই ইজর।য়েল একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে তুরস্কের স্বার্থবিরোধী ইস্ট মেড পাইপলাইন প্রকল্প বাতিল করেছে, অপরদিকে সাথে সাথে তুরস্কের প্রস্তাবকৃত নতুন পাইপলাইন প্রকল্প স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। 
তুরস্ক এবং ইজর।য়েলের মধ্যকার এই পাইপলাইন প্রকল্প স্থাপন সফল হওয়ার সম্ভাবনা দেখে গ্রীসও এই প্রকল্পে নতুন করে নিজেদের যুক্ত করার ইচ্ছে পোষণ করেছে। আর তাই এই মাসেই তুরস্ক (সাম্প্রতিক কালে গ্রীসের বড় শত্রু) সফর করতে যাচ্ছে গ্রীক প্রধানমন্ত্রী। বাইরে বলা হচ্ছে, ইস্তাম্বুলের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাথে সৌজন্য দেখা করতে যাচ্ছে গ্রীক প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু আসল কারণ তো এই গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প যে তা তো বলার উপেক্ষা রাখে না।
★ সংকট!
সবমিলিয়ে ইজর।য়েলের স্বার্থের অনুকূল হলেও দেশটির পক্ষ থেকে বেশকিছু জটিলতা রয়েছে তুরস্কের উপর আস্থা স্থাপন করার জন্য। 
→ ফি লিস্তিনের পক্ষে তুরস্কের বলিষ্ঠ সমর্থন এবং হ।ম।স নেতাদের তুরস্কে আশ্রয়দান।
→ তুরস্কের উপর দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করলে ইজর।য়েলের মিত্র দেশ গ্রিস এবং সাইপ্রাস মনঃক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের জয় মানে ভূ - রাজনীতিতে গ্রীস এবং সাইপ্রাসের পরাজয়।
ইতোমধ্যে সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ ইজর।য়েলের প্রেসিডেন্টের তুরস্ক সফর ঘিরে পরোক্ষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আর তাই মিত্র সাইপ্রাস এবং গ্রীসকে আশ্বস্ত করতে তুরস্ক সফরের আগেই দেশ দুইটি ঘুরে গেছেন ইজর।য়েলী প্রেসিডেন্ট। 
গ্যাস রপ্তানির তালিকায় নিজেদের নাম লেখানোর চেষ্টায় মরিয়া দেশ ইজর।য়েলের জন্য বেটার অপশন হলো তুরস্কের মাটি দিয়ে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করা। কিন্তু তাই বলে ইজর।য়েলের সার্বভৌমত্বের উপর সদা হুমকিদাতা দেশ তুরস্কের উপর নির্ভর হবে ইজর।য়েল!
এছাড়াও এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে তুরস্কের পক্ষ থেকে বেশকিছু সমস্যা রয়েছে।
→ তুরস্ক মুসলিম বিশ্বে তার প্রভাব হারাবে। তুরস্কের পররাষ্ট্র নীতি আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে কৌশলগত নীতি গ্রহণ করার দিকে ধাবিত হচ্ছে। 
→ ইউরোপীয় দেশগুলো এক শত্রু রাশিয়ার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেক প্রক্সি শত্রু তুরস্কের কাছে ধর্ণা দিবে কিনা সেটাও দেখার বিষয়।
→ ভূমধ্যসাগরের গ্যাস কখনোই রুশ গ্যাসের পরিপূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। কারণ ইউরোপ বর্তমানে প্রতি বছর রাশিয়া থেকে যেখানে ১৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস আমদানি করে, সেখানে ইজরায়েল বছরে সর্বোচ্চ ১০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস প্রদান করতে পারবে ইউরোপকে।
পরিশেষে বলা যায়, অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকা তুরস্কের জন্য এই পাইপলাইন প্রকল্পটি একটা আশীর্বাদ হতে পারে। আবার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ইজরায়েলের সাথে মিত্রতা স্থাপনের কারণে আদর্শিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বেশকিছু সমস্যায় পড়তে হবে দেশটিকে। হয়তো এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এরদোয়ান তার দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করে অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে। কিন্তু সেইসাথে এরদোয়ান তথা তুরস্কের বিশ্বটাও কিন্তু ছোট হয়ে আসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্ব রাজনীতির দক্ষ খেলোয়াড় এরদোয়ান একসাথে এত সমস্যা কি করে মোকাবিলা করবেন!

Comments

Popular posts from this blog

জিরো কুপন বন্ড কী? এইটা কিভাবে কাজ করে?

ব্যাংক ভাইবা - মোঃ ইউসুফ আলী

১ম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা-- আল-আমিন আহমেদ