After Hegemony অথবা নয়া বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ছোট রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে "The Anarchical Society" নামে একটি বিখ্যাত টার্ম রয়েছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হেডলি বুল এই পরিভাষাটি সর্বপ্রথম সামনে নিয়ে আসেন। এই Anarchical Society বলতে বুঝানো হচ্ছে যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোন একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ করলে; সেই রাষ্ট্রকে তার অপরাধের কারণে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার জন্য কিংবা সেই অপরাধ থেকে রাষ্ট্রটিকে বিরত রাখার জন্য কোনো কার্যকরি আন্তর্জাতিক সংস্থা বা অভিভাবক নেই।
একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে আমরা যে বিশ্বব্যবস্থায় বসবাস করছি সেটিকে একটি নৈরাজ্যকর সমাজ হিসেবে তুলনা করা হয়। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রগুলো তাদের জাতীয় স্বার্থের "Core Interests" কে বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় পারষ্পরিক দ্বন্দ্ব ভুলে একটি কমন প্লাটফর্মে আসতে পারছে না। উল্লেখ্য, এই "Core Interests" এর মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের এমন সকল স্বার্থ যেগুলো রক্ষা করতে রাষ্ট্র প্রয়োজনে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং রাষ্ট্র কোন ধরনের কম্প্রোমাইজ করতে চায় না। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির কর্মক হিসেবে রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোন কার্যকরী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বা সংস্থা না থাকায় দুটি সমস্যা দেখা দিয়েছে।
প্রথমত: "Zone of Privilege Interests" তত্ত্ব মতে, হেজিমন রাষ্ট্রগুলো কৌশলগত কারণে তাদের প্রতিবেশী দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে গিলে খেয়ে ফেলতে চায়। আর এটাই তাদের স্বভাব। তাই কার্যকরী আন্তর্জাতিক সংস্থা না থাকায় একটি বড় রাষ্ট্র তার প্রতিবেশী ছোট রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ করলেও বড় রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষণে "Seeing Like a State" এই টার্মটির সাথেও পরিচিত হওয়া আবশ্যক। এই পরিভাষাটির মূল কথা হচ্ছে, পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে একটি রাষ্ট্র তার জাতিগত আদর্শ ও মতাদর্শকে গুরুত্ব দেয় না। কোন একটি বিতর্কিত ইস্যুর উপর পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অবস্থান বিবেচনা করে না। রাষ্ট্র সবসময় বিষয়টিকে রাষ্ট্রের চোখ দিয়ে দেখে। যেমন- প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ ইরাকের পক্ষে অবস্থান নিলেও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। অর্থাৎ চলমান আন্তর্জাতিক ইস্যুকে নাগরিকদের চোখ দিয়ে না দেখে রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করতে হয়। মতাদর্শগত কারণে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর অবস্থান ইউক্রেন এর পক্ষে থাকলেও কেন এই রাষ্ট্রগুলো প্রত্যক্ষভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে না? উত্তর হচ্ছে বিষয়টিকে মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের চোখ দিয়ে দেখতে হচ্ছে। তাই "The Anarchical Society" আমাকে বলছে যে, নিজ রাষ্ট্রের সিকিউরিটি রক্ষার জন্য অন্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আমার যতটুকু সক্ষমতা থাকা দরকার আমাকে ঠিক ততটুকুই সক্ষম হতে হবে।
পুরো বিংশ শতাব্দী জুড়ে রাষ্ট্রগুলো তাদের নিরাপত্তা রক্ষার্থে Offensive Realism'এর উপর বিশ্বাস করলেও বর্তমান সেটি অনেকাংশেই সম্ভব হচ্ছে না। তাই একুশ শতকের বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রগুলো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দ্বারস্থ হচ্ছে Defensive Realism'এর উপর। এর মূল কথা হচ্ছে, অন্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে নিজেকেই সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হবে। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে এটিই হচ্ছে। এজন্যই "Rogue State" হিসেবে পরিচিত ইরান ও উত্তর কোরিয়া নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ করার প্রতি অধিক মনযোগ দিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে কেউ আক্রমণ করতে পারবে? উত্তর হলো আক্রমণ করার সাহস দেখাবে না। কারণ উত্তর কোরিয়ার উপর ১০টি মিসাইল হামলা চালালে উত্তর কোরিয়া অন্ততপক্ষে একটি হলেও পাল্টা মিসাইল নিক্ষেপ করতে পারবে। তাই বর্তমানে রাষ্ট্রগুলো আগাচ্ছে Defensive Realism'এর দিকে।
চলমান সংকট অনুধাবনের জন্য কয়েকটি জটিল প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে আমাদেরকে যেতে হবে।
এক. ৮০'এর দশকে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সূচনালগ্নে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক আইনের অবাধ্যতার অভিযোগ এনে বাংলাদেশ থেকে সকল সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। বর্তমান চলমান সংকটে অথবা এই Anarchical Society তে বাংলাদেশের অবস্থান কী হওয়া উচিত সেটি একটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
দুই. বর্তমান নৈরাজ্যকর বিশ্বব্যবস্থায় একটি ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব? শক্তিশালী এবং আঞ্চলিক হেজিমন রাষ্ট্রের "Zone of Privilege Interests" থেকে বেড় হয়ে বাংলাদেশের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা কৌশল ও পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত?
তিন. একটি সুপার পাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত অবক্ষয়ে বিশ্বের লাভ হবে নাকি ক্ষতি হবে? যুক্তরাষ্ট্র যদি Declining Power এর তালিকায় চলে যায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা "Thucydides Trap" এ পা দিবে কি-না?
চার. পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট রবার্ট কিয়োহেন এর "After Hegemony" ধারণাটি যদি সত্যি হয় তাহলে একুশ শতকের এই বিশ্বব্যাবস্থায় চীনের উত্থান কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে?
পাঁচ. Regionalization, Functionalism ও Democratic Peace Theory-এর বর্ণিত বিশ্বব্যাবস্থায় বিপরীতে আমরা একুশ শতকের যে বিশ্বটি পেতে যাচ্ছি সেটি কেন বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ?
উপরিউক্ত এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর যদি আপনি বের করতে পারেন তাহলে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি বোঝা আপনার জন্য খুবই সহজ। আর সবগুলো প্রশ্নের উত্তর পাবেন 'দি এ্যানাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স' বইয়ে।
এই বইয়ে এমন কিছু একাডেমিক টার্ম ও থিওরি রয়েছে যেগুলো দিয়ে আপনি বর্তমানে চলমান এবং আগামী বিশ্বের যেকোন সংকট খুবই সহজে বিশ্লেষণ করতে পারবেন।
বইটির অসংখ্য প্রি-অর্ডার হওয়ায় লোকবল সংকটে খুব দ্রুত প্রি-অর্ডার বন্ধ করে দিবে। তাই এখনো যারা প্রি অর্ডার করতে চান দ্রুত করে ফেলার অনুরোধ রইলো।
বইটি প্রি-অর্ডার করার লিংক:
https://forms.gle/JxDW1grwdVqfzFeFA
মোহাম্মদ মিরাজ মিয়া
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
(দ্বিতীয় পর্বটি শীঘ্রই পোস্ট দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাই সাথেই থাকুন।)
Comments
Post a Comment