বিশ্বজুড়ে নতুন বছরে আট চ্যালেঞ্জ - Nephilim Resheph
বহু ঘটন-অঘটনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ২০২১ সাল। বিশ্বে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা ইস্যুতে বছরজুড়ে ছিল অনিশ্চয়তা, বিক্ষোভ, দাঙ্গা, সহিংসতা ও প্রাণহানি। ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত নানা দুর্যোগ। তবে সব বাধা মাড়িয়ে বিশ্ব পৌঁছেছে শত চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার ২০২২ সালে। এগুলোর মধ্যে চলতি বছরের সবচেয়ে গুরুত্ব আট চ্যালেঞ্জ নিয়ে পর্যালোচনা করেছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও বিশ্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)। কার্যত এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপরই নির্ভর করবে আগামীর বিশ্ব।
২০২২ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হচ্ছে করোনার গতিপথ। ইতোমধ্যে বহু দেশে এই ভাইরাসের ওমিক্রন ধরন ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, প্রলম্বিত করোনা পরিস্থিতির কারণে আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী অন্তত ৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) হ্রাস পাবে। কারণ, করোনার সংক্রমণ বাড়লে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে চীনের মতো বড় উৎপাদনের দেশগুলো জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করে, যাতে উৎপাদন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। আইএমএফের আশঙ্কা, গত অক্টোবরের তুলনায় ওমিক্রনের কারণে এ বছর জিডিপি ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হ্রাস পাবে। কারণ বেইজিং ইতোমধ্যে ট্যাক্স কমিয়েছে। ডেলটার ধকল সামলাতে না সামলাতেই ওমিক্রন থাবা বসিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। মহামারি দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেখানে মুদ্রাস্ম্ফীতিও বাড়ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দেশগুলোর করোনা কূটনীতির কারণে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনীতিও বিপর্যস্ত। এ জন্য তাদের সহজ শর্তে দ্রুত ঋণ না দিলে অর্থনীতি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছে আইএফএম।
ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্নিষ্ট সমর কৌশল বাড়ানো এবং আঞ্চলিক এশীয় দেশগুলোকে প্রলুব্ধ করায় নতুন বছরটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে এ অঞ্চলে প্রভাববলয় গড়ে তুলেছে চীন। ওয়াশিংটন এখনও সিপিটিপিপি বা আইপিইএফের মতো জোট চালু না করলেও নতুন ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্কের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও চীনের সঙ্গে বিরোধে জড়ানো দেশগুলোকে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও জ্বালানির মতো সহায়তা দিচ্ছে তারা। তা সত্ত্বেও সিপিটিপিপিতে চীনের যোগদান এবং রুশ বাধা অতিক্রম করে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার তাদের জন্য চ্যালেঞ্জের হবে।
নতুন বছরে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উত্থান মোকাবিলা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা। অথচ তাদের নিজেদের দেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে বহু ফারাক রয়েছে। এ ছাড়া এখনও বাইডেন চীনকে মোকাবিলার মতো প্রতিযোগিতামূলক কৌশল প্রণয়ন করতে পারেননি। তবে কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা দিয়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে তুলে ধরা যাবে হয়তো। এ ছাড়া একমুখী বাণিজ্যনীতি ও প্রস্তাবিত দেশীয় বিনিয়োগ কৌশল নিলেও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতির লঙ্ঘন হতে পারে। তাই নতুন গড়া ইউএস-ইইউ ট্রেড অ্যান্ড টেকনোলজি কাউন্সিলের মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিকে প্রভাব বিস্তার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ। এ সময় চীনও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে সমৃদ্ধ হতে নীতি প্রণয়ন করেছে তারা।
নতুন বছরে ডিজিটাল মুদ্রার কারণে অর্থব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সিস (সিবিডিসি) ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবস্থাপনা জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে। ইতোমধ্যে এমন ডিজিটাল মুদ্রার অনুমোদন দিয়েছে কিছু দেশ। অনলাইনে লেনদেনের ক্ষেত্রে এটা ব্যবহূত হচ্ছে। চীনের বড় অর্থনীতির দেশগুলো এবং অনলাইন জায়ান্টরা সিবিডিসি ও ই-সিএনওয়াইর মতো ডিজিটাল মুদ্রার সমর্থন করায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। বিটকয়েনের ব্যবহার বাড়ছে। এগুলোর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গবেষণা এখনও চলমান থাকায় অনেকেই তা নিয়ে অন্ধকারে রয়েছে। তবে এর কিছু সুবিধার কারণে অনলাইন গ্রাহকরাও এর দিকে ঝুঁকছেন।
বৈশ্বিক যোগাযোগ প্রতিযোগিতার তীব্রতা মহাকাশেও পৌঁছেছে। ২০২২ সালে এটি আরও বাড়বে। সামরিক ও পর্যটনের জন্য মহাকাশে স্টেশন নির্মাণ প্রতিযোগিতা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো সম্প্রতি সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্সের স্টারলিংক ও অ্যামাজনের প্রজেক্ট কুইপারও নতুন নতুন উপগ্রহ পাঠাচ্ছে। পর্যটকদেরও মহাকাশের বিষয়ে আগ্রহ বাড়ছে। এরই মধ্যে মহাকাশে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যানের সংঘর্ষ এবং চীনের মহাকাশ স্টেশনে আশঙ্কাজনক দুর্ঘটনা এড়ানোর খবর পাওয়া গেছে।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের ভূমিকায় আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ২৬কে 'ব্লা, ব্লা, ব্লা' বলে আখ্যা দিয়েছেন সুইডিশ জলবায়ুকর্মী গ্রেটা টুনবার্গ। কারণ, এর আগের ২৫টি সম্মেলনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। তার পরও ২০৫০ সালে কার্বনশূন্য লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সম্মেলনের খসড়া চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরই কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করতে হবে।
চলতি বছরের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ টিকাবৈষম্য দূর করা। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, টিকা দিতে দিতে বিশ্বের প্রত্যেকটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায় না নেওয়া পর্যন্ত করোনা মহামারিকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। অথচ গত বছর উন্নত-ধনী দেশগুলোর প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ টিকার পূর্ণ ডোজ পেলেও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ১০ ভাগ মানুষও টিকার এক ডোজ পায়নি। মহামারি দূর করতে টিকার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার হুমকিতে পড়েছে। স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র প্রভাব বিস্তার করছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে দেশে দেশে বিক্ষোভ হচ্ছে। সম্প্রতি মিয়ানমার, সুদান, মালি, ইথিওপিয়া, নিরাকাগুয়া, আফগানিস্তানসহ বহু দেশে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে। এগুলোসহ বহু দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এসব দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষাই ২০২২ সালের বড় চ্যালেঞ্জ।
সিএনএন ও সিএসআইএসের প্রতিবেদন অবলম্বনে
Comments
Post a Comment