ডিজিটাল সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ও বাংলাদেশ - Nephilim Resheph
সৃজনশীল খাতকে বলা হয় বৈশ্বিক অর্থনীতি বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্স। কভিড-১৯-পূর্ববতী সময়ে পুরো বিশ্বের সৃজনশীল শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সক্রিয় ছিল এ মাধ্যমের সৃষ্টিশীল কর্মীরাও। কভিড-১৯ এসে সে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ালেও ফের জেগে উঠছে সৃজনশীল খাত। ক্রমেই ডিজিটাল সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ নতুন সম্ভাবনারই বার্তা দিয়ে চলেছে।
দিন বাড়ি যায়, চড়ে পাখির ডানায়, এক জীবনের বসন্ত, দূরের মানুষ আসে অচেনা শহরের মতো গানের রচয়িতা রাসেল ও’নিল। তার গানগুলো দেশে বেশ জনপ্রিয়। তরুণদের মুখে মুখেও ফিরেছে একটা সময়। বিশেষ করে বাপ্পা মজুমদারের গাওয়া দিন বাড়ি যায় গানটি।
৩০ ডিসেম্বর। ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেহ দায়ী নয়’ এমন একটি সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেন রাসেল। রাসেল ও’নিল কেন মারা গেলেন? কিংবা রাসেল ও’নিলদের মতো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত মানুষরা কেমন আছেন? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ জরুরি।
আর সে উত্তরগুলো খুঁজতে হলে চোখ রাখতে হবে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বদলে যাওয়া পটভূমির দিকে। পেশা হিসেবে যারা সৃজনশীলতা চর্চা করেন, যেমন সংগীতশিল্পী, লেখক, অভিনেতা, কবি, নৃত্যশিল্পী, চিত্রনাট্য লেখক, গীতিকার, নির্মাতা। তাদের অনেকেরই জীবিকার বন্দোবস্ত করার জন্য বিকল্প কাজের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এখনো। আমাদের দেশে, এ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে ডিজিটাল সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ থেকে সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি কতটা সম্ভব হবে সে প্রশ্ন আজ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে কভিড-১৯-এর প্রেক্ষাপটে নতুন গতি যোগ হয়েছে ডিজিটাল সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে। ডিজিটাল কনটেন্ট এসে বদলে দিয়েছে দেখা-শোনা-অবসর-বিনোদনের অনেক কিছু। বিশেষ করে ফিজিক্যাল গুডস, যেমন: বই, সংগীত, চলচ্চিত্র, সিরিজ, ভিডিও গেমিংয়ের কথা যদি বলা হয়। অ্যামাজন, অ্যাপল, নেটফ্লিক্স, স্পোর্টিফাই, টিকটক কিংবা ইউটিউবের মতো ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোর প্রচার-প্রসার দুটোই সমানতালে অগ্রসরমাণ। স্ট্রিমিং, বিজ্ঞাপন ও তথ্য ভাগাভাগির মতো কাজের মাধ্যমগুলো উত্সাহিত করছে অর্থ উপার্জন তথা বৈচিত্র্যময় আয়কে। কপিরাইট রাজস্ব বাড়ছে। ডিজিটাল উত্সগুলো থেকেও আয় বাড়ছে আগের তুলনায়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোও সম্পৃক্ত এখানে। আমাদের অংশগ্রহণও বাড়ছে যেমন নেটফ্লিক্স, জি ফাইভ গ্লোবাল, হইচইয়ের মতো বিদেশী প্লাটফর্মে বাংলাদেশের সিরিজ, চলচ্চিত্র দেখানো হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ডিজিটাল সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশের এ সন্ধিক্ষণে আমরা কতটা প্রস্তুত?
ডিজিটাল ক্রিয়েটিভ ইকোনমির ওপর গবেষণা করেছেন ড. কেথ নার্স। তিনি তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, ডিজিটাল সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাব্য সুবিধা পেতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একধরনের বাঁকবদলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আর তা হচ্ছে বর্তমানের সাধারণত কম মূল্য সংযোজিত ও স্বতন্ত্র অনুশীলনকারী শিল্প ও ব্যবসা মডেল থেকে একটি কৌশলগত সহযোগিতামূলক পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হওয়া, যা সৃজনশীল ও ডিজিটাল কর্মী এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বড় ধরনের নীতিগত সুবিধা দিতে সক্ষম হবে।
যেমন কপিরাইট-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর যথাযথ সমাধান ও সৃজনশীল কার্যক্রমের বাণিজ্যিকীকরণের জন্য আর্থিক সমর্থন। এছাড়া রয়েছে সরকারের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও—বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। উদ্ভাবনমূলক গবেষণার জন্য সমর্থন প্রদান। সৃজনশীল অর্থনীতির খাতভিত্তিক গুচ্ছ উন্নয়ন ও ডিজিটাল বাজার উন্নয়নবিষয়ক বোঝাপড়া বৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি। মোদ্দাকথা, সৃজনশীল কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ নিয়ে কাজ করবে এবং তাদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবে—এমন সক্ষম প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। সর্বোপরি সৃজনশীল খাতের সঙ্গে সরকারের নীতি-কাঠামোর সমন্বয় ঘটানো।
আমরা যদি আর্থিক ও বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে বিষয়টি সহজেই অনুমান করতে পারি যে কভিড-১৯ মহামারী বিশ্বব্যাপী উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য প্রভাবসহ জীবন ও জীবিকার বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। সেখানে আরো কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সৃজনশীল পেশার মানুষরা। করোনা রূপ বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভাইরাসটির এ রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হচ্ছে বিশ্বকে। বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আর লকডাউন আরোপ করতে হচ্ছে। যা অন্যসব কিছুর মতো সৃজনশীল অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে কনসার্ট, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, বই প্রকাশনা থেকে শুরু করে মিউজিক টুরের মতো নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রায় বন্ধ হওয়ায় খাতসংশ্লিষ্টদের আয়ের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে বেশ।
আমরা জানি, বিশ্ব অর্থনীতি গত দুই দশক বা তারও বেশি সময় ধরে বড় রকমের রূপান্তরের পথে রয়েছে। যেখানে নতুন ও উদীয়মান ব্যবসায়িক মডেল এসে দখল করে নিচ্ছে পিছিয়ে পড়া অ-উদ্ভাবনী খাতগুলোর জায়গা। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে চোখে পড়ার মতো যে পরিবর্তনটা হয়েছে তা হলো ডিজিটাল বিশ্বায়ন এবং অনলাইন ব্যবসার পরিসর বৃদ্ধি। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনলাইন কার্যক্রম বেড়েছে কয়েক গুণ। কভিড-১৯-এর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে সংকটটি খুচরা ব্যবসা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, টেলিযোগাযোগসহ অডিও-ভিজুয়াল পরিষেবার মতো সেক্টরগুলোতে অনলাইনে কার্যক্রম সম্প্রসারণে কোম্পানিগুলোকে আগের তুলনায় অধিক মনোযোগী করে তুলছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলোও জোর দিচ্ছে অনলাইন ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকে। তাছাড়া কভিডের নানাবিধ বিধিনিষেধের জন্য ক্রেতাদের আচরণগত পরিবর্তনও হয়েছে। যা ইঙ্গিত দেয় অনলাইন পরিষেবার গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনেরও। তাই ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিষেবার বর্ধিত সরবরাহ ব্যবসা-বাণিজ্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ক্রস বর্ডার অনলাইন স্ট্রিমিং (যার মধ্যে রয়েছে সংগীত, চলচ্চিত্র, সিরিজ) বেড়েছে বা আগের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তাই নেটফ্লিক্স, স্পটিফাই, টিকটক আর ইউটিউবের মতো অনলাইন প্লাটফর্মের ব্যবহারকারী বা ভিউয়ার বৃদ্ধির ফলে এদের আয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ।
যদিও এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে সৃজনশীল কনটেন্ট সরবরাহকারী ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোর প্রসার বৃদ্ধি পাচ্ছে কমপক্ষে এক দশক ধরে। তবে নাটকীয় গতি যোগ হয়েছে কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে। সবচেয়ে চমত্কার বিষয়টি হচ্ছে, কভিড সংকট সৃজনশীল ডিজিটাল অর্থনীতির আর্থিক মূল্যের বিষয়টিকে সামনে এনেছে গুরুত্বের সঙ্গে।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখা হয়, তাহলে উন্নত দেশের পাশাপাশি উন্নয়শীল দেশগুলোতে ডিজিটাল প্লাটফর্মের কনটেন্ট তৈরি করেন যারা, তাদের জন্য বিষয়টি খানিকটা জটিল। এক্ষেত্রে প্রথম যে প্রশ্নটি আসে, তা হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সৃজনশীল কর্মী-উদ্যোক্তাদের আমরা কি চলমান প্রবণতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নীতি-কাঠামোগত সমর্থন দিতে সমর্থ? দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল দুনিয়ার বৈচিত্র্যময় বিষয়গুলো মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সৃজনশীল পণ্যের মেধা সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করতে আমরা কি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সক্ষম?
প্রতিটি প্রশ্নের সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ। আরো প্রয়োজন একটি জোরদার সংস্কৃতিবিষয়ক নীতিমালা, একই সঙ্গে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
ডিজিটাল সৃজনশীল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফিচার (বৈশিষ্ট্য) হচ্ছে কপিরাইট। সমস্যা হচ্ছে কপিরাইট বা রয়্যালটি থেকে আয় সংগ্রহের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেকটাই পিছিয়ে। ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অব সোসাইটিস অব অথরস অ্যান্ড কম্পোজারসের (সিআইএসএসি) গ্লোবাল কালেকশনস প্রতিবেদন, ২০১৯ অনুসারে বিশ্বব্যাপী রয়্যালটি সংগ্রহে ইউরোপের অংশগ্রহণ ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও উত্তর আমেরিকা ২২ দশমিক ৬ শতাংশ, মোট ৭৯ শতাংশ। এদিকে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার ৫ দশমিক ৪ এবং শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে এর পরিমাণ ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এ অঞ্চলের নেতৃত্ব দিচ্ছে জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া।
ভারতের অংশগ্রহণও বাড়ছে। বিশেষ করে গত দুই বছরে। আর এর নেপথ্য কারণ হচ্ছে তারা বেশকিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, যেমন ডিজিটাল লাইসেন্সিং চুক্তির সিরিজ কার্যক্রম। ইন্ডিয়ান পারফর্মিং রাইটস সোসাইটির (আইপিআরএস) কার্যক্রম বৃদ্ধি। ২০১৮ সালে আইপিআরএস বড় বড় স্ট্রিমিং খেলোয়াড় যেমন স্পোর্টিফাই, অ্যাপল, অ্যামাজন এমনকি ইউটিউবের ইউজিসি (ইউজার জেনারেট কনটেন্ট) এবং মিউজিক স্ট্রিমিং সার্ভিসের সঙ্গে লাইসেন্স ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। যা বছরে তাদের ডিজিটাল আয় সংগ্রহের পরিমাণ সাত গুণ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি দেশটি কপিরাইট আইনের সংস্কার আনে। ফলে সৃষ্টিশীল কাজের সঙ্গে সম্পৃক্তদের কাজের জন্য আইনি পরিবেশ শোভন ও উন্নত হয়। ভারতীয় আইনসভা দ্বারা সংশোধিত নতুন কপিরাইট আইনে বলা হয়েছে, যে কেউ ‘যেকোনো ফর্মে’ যদি কোনো সংগীতশিল্পী, গীতিকারের সুর ও গান ব্যবহার করেন, তাহলে ওই শিল্পী তার রয়্যালটির সমান অংশ দাবি করতে পারবেন। তথ্য বলছে, এ আইন প্রবর্তনের ফলে উপকৃত হয়েছে ভারতের সংগীতাঙ্গন।
বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল সৃজনশীল অর্থনীতি এমন একটি অবস্থানে এসেছে, যা দেশের তরুণ সৃজনশীলদের কর্মসংস্থানের একটি বড় উত্স। তবে এটিকে টেকসই করা জরুরি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কৌশলগত সুযোগ হলো সৃজনশীল খাতের জন্য একটি খাতব্যাপী পদ্ধতি গ্রহণ, এন্ড টু এন্ড বিজনেস সলিউশন এবং চলমান প্রবণতা (ট্রেন্ড) সমর্থন করতে পারে এমন মেকানিজম তৈরির কার্যক্রমকে পৃষ্ঠপোষকতা করা। সৃজনশীল শিল্পকে সহযোগিতা করতে এখানে অংশীজনদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গোটা বিশ্বে ডিজিটাল সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ অর্থনীতিতে এ খাতটির অংশগ্রহণ বাড়ছে, দেশের জিডিপিতেও অবদান রাখছে। সেখানে আমাদের দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। তাই ডিজিটাল সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশের বিষয়টি নিয়ে আমরা যদি এখন থেকে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ না করতে শুরু করি তাহলে কয়েক ধাপ পিছিয়ে পড়ব বৈকি।
Comments
Post a Comment