নারী বিষয়ক গ্রন্থ সমালোচনা (সুলতানার স্বপ্ন) _কৃষিবিদ কাওছার হোসেন
বাংলা সাহিত্যে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচিত সুলতানার স্বপ্ন উপন্যাসটি ইংরেজিতে Sultana's Dream শিরোনামে রচিত। এক শতাব্দী অধিককাল পূর্বে রচিত এ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় মাদ্রাজের "The Indian Ladies Magazikone"-এ । পরবর্তীতে বাংলায় অনূদিত হয়।
গ্রন্থে বেগম রোকেয়া একটি নারীবাদী স্বপ্নরাজ্য বা ইউটোপিয়ার বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে সমাজে নারী ও পুরুষের প্রচলিত ভূমিকা উল্টে গেছে, নারীরা সমাজের যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রধান চালিকাশক্তি আর পুরুষেরা প্রায় গৃহবন্দী। এই সমাজে কোন অপরাধ নেই, এখানে প্রচলিত ধর্ম 'ভালোবাসা ও সত্যের'।
বেগম রোকেয়া যে সময়ে এই বইটি লিখেছেন সেই সময়ের ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় । তাই, এটিকে অত্যন্ত সাহসী সাহিত্যকর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়।
সুলতানাস ড্রিম’ও এক বিষ্ময়কর লেখা কল্পলোকের কাহিনীর মত। কাহিনীটি যিনি বলছেন তার নাম সুলতানা। তিনি স্বপ্নে দেখেন, তিনি এক আশ্চর্য জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নাম তার নারীস্থান (Lady land)। এখানে মশা নেই, পুলিশ নেই, অশান্তি নেই। কারণ কি? কারণ, পুরুষ এখানে শৃংখলাবদ্ধ।
ভগিনী সারা নামে যে মহিলা সুলতানাকে সঙ্গ দিচ্ছে, সে বলছে, "স্বয়ং শয়তান যেখানে শৃংখলাবদ্ধ সেখানে শয়তানীর সুযোগ কোথায়? মেয়েরা তাই ভারী নিরাপদ। পুরুষরা রয়েছে অন্তপুরে।"
এখানে পুরুষরা করে দেহের কাজ অার মেয়েরা করে মস্তিষ্কের । এর আছে দেহ, ওর আছে মন। বিভজনটা এই রকমের। পুরুষ বন্দী হয় নিজের ব্যর্থতায়। পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে কয়েকজন বিদ্রোহী, যারা ওই রাজ্যের দুঃশাসন মেনে নিতে পারে নি, তারা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলো এই রাজ্যে। ন্যায়ের প্রতিপালক এ রাজ্যের রাণী তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন । তখন লাগলো যুদ্ধ। দলে দলে সৈনিকরা (সবাই তারা পুরুষ) আহত ও নিহত হতে লাগলো। রাজ্য বিপন্ন, পুরুষ নিঃশেষ প্রায়। কি করা যায়? সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। আহার নিদ্রা বন্ধ হবার উপক্রম। শেষে এগিয়ে এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান। তিনি মহিলা এবং তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেই, সবাই ছাত্রী। দুই হাজার স্বেচ্ছাসেবিকা নিয়ে রওনা দিলেন। না, সীমান্ত পর্যন্ত যাননি তারা। হাতাহাতি করেননি শত্রুপক্ষের সঙ্গে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংগৃহীত সূর্যের কিরণ দূর থেকে নিক্ষেপ করেছেন শত্রু সীমান্তে। শত সহস্র সূর্য মর্ত্যে নেবে এলে যেমন প্রবল তাপ সৃষ্টি হবার কথা তেমন তাপ নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো শত্রুপক্ষের দিকে। ফলে তারা পালিয়ে জীবন রক্ষা করল। যুদ্ধযাত্রার আগে, অধ্যক্ষা শর্ত দিয়েছিলেন পুরষদের সবাইকে অন্তঃপুরে প্রবেশ করতে হবে। পর্দার প্রয়োজনে এটা আবশ্যক। সেই থেকে পুরুষরা সবাই ঘরে থাকে। মেয়েরা আছে বাইরে।
সুলতানা পুরুষশাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের মেয়ে, চলাফেরায় দ্বিধা ছিলো প্রথমে, লজ্জা ও সংকোচ জড়িয়ে যাচ্ছিলো পা; ভগিনী সারা বললেন, “এ রাজ্যে অমন পুরষপনা চলবে না, মেয়েরা এখানে স্বাচ্ছেন্দ্যে চলে।”
বেগম রোকেয়ার এই লেখাটি তাঁর স্বামী এক নিঃশ্বাসে পড়েছিলেন; পড়ে বলেছিলেন, “এ একটি ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ।” হ্যাঁ, তাই। কিন্তু ব্যক্তিগত নয়। প্রতিশোধটা সমষ্টিগত। তাছাড়া পুরষকে বন্দী করা রোকেয়ার লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য নারীকে মুক্ত করা। যে জন্য তিনি বিজ্ঞানকে নিয়ে এসেছেন তার এই লেখায়। প্রতিশোধ নয়,আসলে তিনি চান মুক্তি।
ওই কল্পরাজ্যে দুটি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বেগম রোকেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য মেয়েদেরকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়া নয়, সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া। এ হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সৃষ্টিশীল গবেষণাকেন্দ্র। আর এ জ্ঞান অর্থহীন কূটতর্কের কারুকার্য সৃষ্টির কিংবা সূর্য থেকে সূর্যকিরণ বের করবার নয়। বিশ্ববিদ্যালয় দুটির একটি আবিষ্কার করেছে মেঘ থেকে পানি সংগ্রহের পদ্ধতি, যার ফলে মানুষকে আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়না। অপরটি আবিষ্কার করেছে সৌর শক্তি সংগ্রহের পদ্ধতি, যে শক্তি দিয়ে রান্নাবান্না থেকে যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্ত সবকিছু করা যায়। ওই রাজ্যে এরোপ্লেন চলে। ওরা বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার করে কৃষিকার্যে।
বেগম রোকেয়া যখন এ লেখা লেখেন তখন ভারতবর্ষে বিমান দূরে থাক, মোটর গাড়ি এসে থাকলেও তিনি দেখেননি। বিদ্যুৎশক্তি সম্পর্কেও তার কোন প্রত্যক্ষ ধারণা ছিলোনা। মেঘ থেকে পানি ও সূর্য থেকে শক্তি সংগ্রহের চেষ্টা সেকালে বিজ্ঞানীরাও করছিলেননা। সেদিক থেকে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের চিন্তা অনবদ্য।
রোকেয়ার এই কল্পকাহিনীটি অবশ্য যত প্রশ্নের জবাব দেয় তার চেয়ে বেশী প্রশ্ন উত্থাপন করে। মূল প্রশ্নগুলো সাধারণ। এই রাজ্য প্রতিষ্ঠা হবে কী করে? দ্বিতীয়ত, একে রক্ষা করা যাবে কোন উপায়ে? দেখা যাচ্ছে এখানে সেনাবাহিনী রয়েছে। তারা যদি হঠাৎ একদিন ক্ষমতা দখল করে নেয়, এবং সামরিক আইন জারী করে বসে কিংবা যদি তারা পার্শ্ববতী রাজার সঙ্গে যোগসাজস করে অন্তঘাতী তৎপরতা চালায়? সৈন্যদেরকে কি দমিয়ে রাখা হবে, এখন যেমন পুরুষদের আটকে রাখা হয়? তাহলে তো আবার সেই অসাম্য। পুরুষদের অবরুদ্ধ করে মেয়েদের শাসন তো আবার সেই অন্যায়েরই সৃষ্টি করবে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মেয়েরা এখন প্রতিবাদমুখর।
নানান প্রশ্নের অবতারণা করলেও, এ উপন্যাস সৃষ্টির পেছনের কারণ ছিল প্রসংশনীয়। পিছিয়ে পড়া নারী জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির মাধ্যমে নেতৃত্ব দেয়ার কথা জানিয়ে দেয় এ উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলি। পরাধীন ভারতবর্ষের মেয়েরা চলাফেরার দ্বিধা, লজ্জা ও সংকোচ ছাড়িয়ে স্বাচ্ছেন্দ্যে না চললে নিজেদের প্রাপ্য আদায় করতে পারবে না- সে ব্যাপারে ঘটনাবলী সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এ উপন্যাসে।
Comments
Post a Comment