বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ ২৬) ও বাংলাদেশ - Latifur Rahman Liton
বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ ২৬) ও বাংলাদেশ
জাতিসংঘের উদ্যোগে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে ৩১ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর কপ২৬ বা জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে যা 'কনফারেন্স অব দি পার্টিস'র সংক্ষিপ্তরূপ।
কেন এই সম্মেলন?
প্রধানত শিল্পোন্নত দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তেল-গ্যাস-কয়লা পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকারক কার্বন পরিবেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন হচ্ছে। এতে বনে আগুন লাগছে, ঝড়-বন্যা হচ্ছে, অতি শীত-গরম হচ্ছে, বরফ গলে নিম্নাঞ্চল হুমকির মুখে ফেলছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়ছে প্রভৃতি।
এই পরিবর্তন ঠেকাতে জরুরিভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ দরকার। এ লক্ষ্যে ২০০ দেশের প্রতিনিধি ও বিশ্বের ক্ষমতাধর শক্তিসহ ১২০ দেশের রাষ্ট্রনেতারা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, পরিবেশ সংগঠন, বেসরকারি সংস্থার প্রায় ২৫ হাজার প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন।
কাপ ২৬ সম্মেলনের কয়েকটি লক্ষ্যমাত্রা ও উদ্দেশ্যঃ
√মধ্য শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বকে নিরাপদ করণ ও তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রীর মাঝে রাখা।
√জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার নীতি গ্রহণ।
√কয়লার ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে আনা
√বনভূমি রক্ষা করা
√বৈদ্যুতিক যানবাহন চালু করা ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে অধিক বিনিয়োগ করা
√গঠিত তহবিল দ্রুত সচল করা।
সম্মেলনটি মানবজীবনে কী প্রভাব ফেলবেঃ
বিশ্বনেতারা যদি তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত পর্যায়ক্রমে অগ্রসর করতে পারেন- তাহলে এখান থেকে নির্ধারিত হতে পারে-
√আমরা আর কতদিন পেট্রল বা ডিজেলচালিত গাড়ি চালাতে পারব?
√প্রচণ্ড শীত ও গরমে আমরা গ্যাস ব্যবহার করতে পারব কিনা, তা ঠিক হতে পারে।
√ঘন ঘন দেশ-বিদেশের বিমান ভ্রমণ কঠিন হয়ে যেতে পারে।
√আমাদের নিত্যদিনের ভোগ-বিলাসিতায় অনেক কিছুর পরিবর্তন আসতে পারে।
জলবায়ু রক্ষার্থে অর্থায়নঃ
২০২০ সালে ১০০ বিলিয়ন (লক্ষ্যমাত্রা) ডলার
২০১৮ সালে ৭৮.৯ বিলিয়ন ডলার
২০১৭ সালে ৭১.২ বিলিয়ন ডলার
২০১৬ সালে ৫৮.৬ বিলিয়ন ডলার
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিতর্কঃ
জলবায়ু ও পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বড় বিতর্কের বিষয় হচ্ছে, কে বা কারা অধিক কার্বন নিঃসরণ ও জলবায়ুর ক্ষতির জন্য দায়ী।
উন্নত দেশগুলো এজন্য হালের শিল্পোন্নত ও অধিক জনসংখ্যার দেশ চীন-ভারতকে দায়ী করে থাকে। তাদের যুক্তি এদের জনসংখ্যা বেশি, ভোগও বেশি সুতরাং এরাই পরিবেশ বিপর্যয়ে অধিক দায়ী।
অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বক্তব্য- শিল্প বিপ্লবের পর উন্নত দেশগুলো প্রচুর জ্বালানি ব্যবহার করে মুনাফার নামে পরিবেশ ও জলবায়ুর অধিক ক্ষতি করেছে এবং সে কাজটি করা হয়েছে কয়েকশ বছর ধরে তেল-গ্যাস-কয়লা পোড়ানোর মাধ্যমে। চীন-ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিল্পায়নের ইতিহাস ৫০-৬০ বছরের। পশ্চিমারা সে কাজ করে এসেছে তিনশ-চারশ বছরের অধিক সময় ধরে।অতএব পরিবেশ বিপর্যয়ের দায় তাদেরই অধিক নিতে হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে, তখন পরিবেশ রক্ষার কথা বলে তাদের পিছনে ফেলার চেষ্টা চলছে। প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি বাণিজ্যে চাপে পড়াতে তারা জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা বলছে।
এই বিতর্ক যৌক্তিক হলেও জলবায়ু বিষয়ের গবেষণা অনেক দিনের নয়। যখন থেকে বিজ্ঞানীরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন, তখন থেকে এ আলাপ-জনমত প্রবল হয়েছে। পরিবেশবাদীরা সংগ্রাম করছেন, অতঃপর বিশ্বের ক্ষমতাধর শাসকরা সতর্ক হয়েছেন। জাতিসংঘ জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, নানা কর্মসূচি নিয়েছে। তারই ধারাবাহিতা আজকের এই জলবায়ু সম্মেলন।
বাংলাদেশের জন্য এ সম্মেলনের গুরুত্বঃ
বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকির তালিকায় থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকির সূচক-২০২১ প্রতিবেদন মতে, জলবায়ুর পরিবর্তন জনিত দুর্যোগের ক্ষতির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাবে এর অবস্থান পঞ্চম।
জাতিসংঘের ইউনিসেফের একাধিক প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশের শিশুরা এই ঝুঁকির তালিকায় ১৫তম। কারণ যেকোনো দুর্যোগে তাদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের বরফ গলে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি করে ভূ-ভাগের নিম্নাঞ্চলকে ক্রমশ তলিয়ে দেবে। এতে সমুদ্র উপকূল, লোকালয় ও আবাদি জমির ক্ষতি হবে। সে ঝুঁকিতেও বাংলাদেশ শীর্ষে। সুতরাং বাংলাদেশের জন্য এ সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Comments
Post a Comment