কোয়াড এবং ইন্দো-প্যাসিফিক জোট
কোয়াড এবং ইন্দো-প্যাসিফিক জোট
এখনও বিশ্ববাসী কভিড-১৯ এর কারণে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে মানুষ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় কভিডে মারা যাচ্ছে অনেক মানুষ। আমরাও এর বাইরে নই। তবে স্বস্তির বিষয়, এখন আমরা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির মধ্যে এসেছি। এখনও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কভিডের টিকা থেকে বঞ্চিত। ধনী দেশগুলো শত শত কোটি ডোজ টিকা আগাম কিনে নিয়েছে। গরিব দেশগুলো তো বটেই, অনেক মধ্যম আয়ের দেশও টিকা কিনতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। টিকা বৈষম্যের শিকার হয়েছে গরিব দেশের মানুষ। মানুষের এই মৃত্যুর মিছিলে পড়ে থাকার মধ্যেও টিকা-ব্যবসা নিয়ে ধনী দেশগুলোর মানবিক ও মানসিক অবস্থা আমরা টের পাচ্ছি। তাদের কাছে সাধারণের মৃত্যু কোনো বিষয়ই নয়। তারা টিকার এই যে বৈষম্যকরণ এবং তাকে পুঁজি করে ব্যবসায়িক লাভকেই বড় করে দেখছে। এই চিত্র বিশ্বের ধনী দেশগুলোকে বিচলিত করেনি। জাগ্রত করতে পারেনি তাদের মানবিকতা। তারই আরেকটা পরিচয় তুলে ধরল যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার ত্রিপক্ষীয় সিকিউরিটি জোট। এই নব্য জোট অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে ১৮ মাসের মধ্যে তৈরি করবে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন। এই সাবমেরিন উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হবে অস্ট্রেলিয়া। এ জোটের ঘোষিত লক্ষ্য ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের প্রভাবকে নস্যাৎ করা। আমরা আগামী দেড় বছরের মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ চীন সাগরেও তাদের পরমাণুশক্তি চালিত সাবমেরিনের উপস্থিতি দেখতে পাব। তার মানে, আগামীতে যে আরেকটি মহাসমরের নিচে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব এ তারই সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষণ। পাশাপাশি চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রতিরোধও তাদের বিশেষ এজেন্ডা।
বিগত শতকের সাতের দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র চায়নি চীন অর্থনৈতিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়াক। এক সময় চীনে গণতন্ত্রের ছিপ ফেলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেপিয়ে দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করেছিল পশ্চিমা বিশ্ব। কিন্তু চীন কঠোর হাতে সে আন্দোলন প্রতিহত করেছে। উত্তর ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বিরোধ, মালাবার স্টেট ও তাইওয়ান স্টেটে বিশ্ববাণিজ্যের জাহাজ চলাচল, সেই সাগরেও চীনের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ধুয়া তুলে টক্কর দেওয়ার বহু চেষ্টার কোনো সুফল পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। এখন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে চীনকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঘেরাটোপের মধ্যে ফেলতে। সে জন্যই প্রথমে কোয়াড (কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ 'কিউএসডি'কে কোয়াড নামেই চেনে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের প্রস্তাবে ২০০৭ সালে এটি গঠিত হয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এ জোটের অংশীদার। তারা জয়েন্ট মিলিটারি এক্সারসাইজে অংশ নেন। নাম এক্সারসাইজ মালাবার) জোট করেও তা ইনঅ্যাক্টিভ রেখেছিল। পরে আবার সে জোট মাথা তোলে ২০১৭ সালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে। এখন জো বাইডেন কোয়াডের পাশে আরেকটি সামরিক জোট তৈরি করেছেন চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরার জন্য।
এ পরিস্থিতিতে ভেতরে ভেতরে খেপেছে নিউজিল্যান্ড। ফাইভ আই-এর (এটি মূলত সিগন্যাল সহযোগিতার জোট) দুই চোখ নিউজিল্যান্ড ও কানাডাকে বাইরে রেখে শুধু অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মিলে এই যে নতুন জোট হলো তাতে কিছুটা হলেও দগ্ধ হবে ভারত। কারণ, ভারত চীনের প্রতিপক্ষের প্রথম ভূ-রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিকের পক্ষে। ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে ভারতে অগ্রাধিকার আছে, কিন্তু নৌ-রাজনীতির ক্ষেত্রে এতটা ভূমিকা রাখার মতো সক্ষম নয়। তাই বলে ভারতের সহযোগ যে দরকার নেই, তা তো নয়। এ নিয়েও ভারতের মনে ক্ষোভ জমেছে, তবে তা অপ্রকাশ্যে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতির কথা আমাদের জানা। এই সম্পর্কের অবনতির কারণ জিংজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনা প্রশাসনের মাত্রাতিরিক্ত নির্যাতনের অভিযোগের ফলে। সেখানকার মুসলিমদের ওপর চীনা প্রশাসনের বিমাতাসুলভ আচরণ বিশ্ববাসী জানে, কিন্তু তার মাত্রা কতটা তা জানা নেই। অস্ট্রেলিয়া তার পশ্চিমা সহযোগীদের সঙ্গে এ প্রশ্নে সমালোচনা করায় চীন সে দেশ থেকে ওয়াইন আমদানির ৯৬ শতাংশই বন্ধ করে দেয়। বাণিজ্য যুদ্ধের এই অভিঘাতে নিউজিল্যান্ড সুযোগটির সদ্ব্যবহার করে। ফলে নিউজিল্যান্ডের ওপরও নাখোশ ওই তিন ধনী দেশ। ইন্দো-প্যাসিফিক সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজিতে তাই তারাই নতুন সামরিক জোট হিসেবে আবির্ভূত হলো। এই জোটে কোনো ইউরোপিয়ান দেশকেই রাখা হয়নি। এই জোটের ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউরোপের ফ্রান্স।
কেন এই তিনটি দেশ এমন এক জোট গড়ে তুলল, যা মূলত ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বর্ণবাদিতায় পর্যবসিত হলো? ফাইভ আই, সেই ১৯৪১-এর ১৪ আগস্টে চোখ মেলেছিল, পাঁচটি ইংরেজিভাষী দেশের ইন্টেলিজেন্স সিগন্যাল আদান-প্রদানের জন্য। তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তারপর এ সিকিউরিটি জোট, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তার মানে, শুধুই সামরিক মেরুকরণ নয়, এ পদক্ষেপ একই সঙ্গে বর্ণীয়করণের মাধ্যমে যে 'শ্রেষ্ঠত্ব' দেখানো হয়েছে নৃতাত্ত্বিক গবেষণায়, এই জোট সেই একই মনোভঙ্গি ও মনোগঠনের দৃষ্টিতে নতুন করে কাঠামো নির্মাণ করছে বা করেছে। মনের অতলে শুধু সম্পদ লুটে নেওয়ার লোভই নয়; একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী কায়দায় এশিয়ার খনিজ ও সামুদ্রিক সম্পদ লুট করাও তাদের লক্ষ্য। উত্তর ও দক্ষিণ চীন সাগরের সম্পদ করায়ত্তের জন্যই সেখানে চীনের আধিপত্য রুখে দেওয়ার নকশা এটি। চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর জন্যই ভারতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য ভারতের ভেতরের তৃষ্ণাকে জাগিয়ে দিয়ে, তাকে প্রযুক্তির নানা উপাদান-উপকরণ হস্তান্তর করে মার্কিনি ভূ-রাজনৈতিক চাল পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোও কম-বেশি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।
দ্বিতীয় 'কোল্ডওয়ার'-এর সূচনা হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। প্রথম কোল্ডওয়ারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া)। এবার প্রতিপক্ষ চীন। কারণ চীনা অর্থনীতি এতটাই গতিশীল, তাদের উন্নতির সোপান চেনাও কষ্টকর। মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর থেকেই সমাজতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্নির্মাণের যে পদক্ষেপ, তা মাত্র ৪৫-৪৬ বছরে তাদের অর্থনীতি শিখরস্পর্শী। তাদের সামরিক শক্তি এতটাই প্রাগ্রসর যে, পশ্চিমা বিশ্ব তাতে বিস্মিত। আমেরিকান নৌবাহিনীকে উত্তর ও দক্ষিণ চীন সাগরে জবাব দিতে পুরোপুরিই সক্ষম তারা। এ কারণেই অস্ট্রেলিয়াকে শামিল করেছে এ জোটে। সুযোগটা হাতছাড়া করেনি অস্ট্রেলিয়া। কারণ সে ৪০ বিলিয়ন ডলারে ফরাসি ঋণ থেকে শুধু মুক্তই হলো না, সেই সঙ্গে নিজেকেও পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন নির্মাতা দেশের মর্যাদায় উঠে এলো। অস্ট্রেলিয়া পরমাণু শক্তির সাবমেরিন নির্মাতা হিসেবে সাত নম্বর দেশে পরিণত হলো।
মানুষের শান্তি ও স্বস্তিতে বেঁচে থাকার যে অধিকার, তা নস্যাৎ করবে এই সামরিক জোট। আর চীনের পৃথিবীব্যাপী 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' যে গরিব ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে উন্নয়নের রাজপথে চলার শক্তি ও সাহস জুগিয়ে চলেছে, তাও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। যোগাযোগ, বৈশ্বিক পর্যায়ে কানেকটিভিটি তৈরির এই পদক্ষেপ 'দেবে আর নেবে/ মেলাবে মিলিবে' চেতনায় সমৃদ্ধ, সেটা অর্থনৈতিক গতিকে অনেকটাই মানবিক সংস্কৃতির অন্তর্গত করবে বলে মনে হয়। আমাদেরও পণ্য যদি যথাসময়ে রপ্তানি করতে না পারি শুধু কানেকটিভিটির অভাবে বা রোড, রেল ও আকাশপথে, তাহলে কি সে উৎপাদন মানুষের ভোগ ও ব্যবহারে আসবে? এ কারণেই যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক চেতনায় এই বোধ জাগরণ প্রয়োজন। যুদ্ধ নয়, লোভ নয়; মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণেই নিয়োজিত হোক তাদের সার্বিক জ্ঞান-গরিমা।
From: Group collection
Comments
Post a Comment