যারা ৪১ তম বিসিএস প্রিলি পাস করেছেন তাদের জন্য - এস এম রুহুল আমিন শরিফ

দাদাকে আদা পড়া খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না
(প্রসঙ্গ লিখিত পরীক্ষা)
-মো: রুহুল আমিন শরিফ
সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
১ম স্থান, ৩৮ তম বিসিএস (প্রশাসন)
নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রস্তুতিকে শাণিত ও সুশৃঙ্খল করে তোলা সম্ভব। কিন্তু শতভাগ প্রস্তুতি একাডেমিক পরীক্ষার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে সম্ভব হলেও চাকুরির পরীক্ষায় সম্ভব নয়। সকল বিষয়ে সবকিছু শিখে পরীক্ষায় বসা ব্যাপারটি তত্ত্বীয়ভাবে বিবৃত হলেও প্রায়োগিকভাবে এর অস্তিত্ব নেই।
বাস্তব চিত্র হলো, একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে অথবা সামগ্রিক পরীক্ষায় তিন ধরনের প্রশ্ন থাকতে পারে। 
১. এমন প্রশ্ন যেগুলোর উত্তর আপনি সুস্পষ্টভাবে জানেন
২. এমন প্রশ্ন যেগুলোর উত্তর পূর্ণাঙ্গভাবে জানেন না, কিন্তু টপিকটি সম্পর্কে আপনার সাধারণ ধারণা আছে
৩. এমন প্রশ্ন যেগুলোর উত্তর আপনি জানেন না, ধারণাও নেই।
আবহমান কাল ধরে সিনিয়রদের একাংশ একটা পরামর্শ দিয়ে আসছেন যে লিখিত পরীক্ষায় যেভাবেই হোক 'ফুল আনসার' করতে হবে। এই পরামর্শের সাথে আমি আংশিক একমত এবং আংশিক দ্বিমত পোষণ করি। আমার বক্তব্য হলো: ফুল আনসার করতে হবে তবে তা যে কোন উপায়ে নয়। কারণ, উপায়ের ধরণ গ্রহণযোগ্যতার সীমানা পেরুলে বুমেরাং হতে পারে।
হাতের লেখার সাথে সাইকোলজির সংযোগ দ্বারা ব্যাখ্যা শুরু করা যাক। আপনি খুব ভালো জানা, আধো আধো জানা এবং না জানা বিষয়ের প্রশ্নের উত্তর লিখতে গেলে আপনার হাতের লেখাতেই তিনটা শ্রেণী ফুটে উঠবে। তিন ক্ষেত্রে লেখার ধরণ মসৃণ, ভাঙাভাঙা এবং বিক্ষিপ্ত এই তিন জাতের হবে। আপাতদৃষ্টিতে পার্থক্যগুলো অনেক সময় অগ্রাহ্য হলেও গভীর পর্যবেক্ষক অভিজ্ঞ চোখে তা ধরা পড়বেই। সাধারণ মানুষ হয়েও একজন শিক্ষক হিসেবে পরীক্ষার্থীদের খাতায় এই তফাৎ আমি বুঝতে পারতাম।
 বিসিএস, ব্যাংক নিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষা এমনকি একাডেমিক পাবলিক পরীক্ষায় অপেক্ষাকৃত অধিক অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও দক্ষ শিক্ষকদের দ্বারা খাতা মূল্যায়ন করানো হয়। বিশেষ করে চাকুরির পরীক্ষার খাতা যাঁরা মূল্যায়ন করেন তাঁরা অত্যন্ত বিজ্ঞ ও জ্ঞানের গভীরতায় অনন্য হবেন এটা যে কেউ আন্দাজ করতে পারেন।
স্মার্টনেস ভালো, কিন্তু ওভার স্মার্টনেস বেকামির নামান্তর। যদি পরীক্ষার্থী হিসেবে আপনি মনে করেন যিনি খাতা মূল্যায়ন করবেন তিনি দায়িত্বে অবহেলা করবেন, নির্দিষ্ট বিষয়ে জানবেন না, ব্যস্ততার কারণে গুরুত্ব দিয়ে খাতা পড়বেন না এবং আপনি চালাকি করলে বুঝতে পারবেন না তাহলে এগুলো নিশ্চিতভাবে আপনার আত্মঘাতী ধ্যান ধারণা। পরীক্ষকগণ বুদ্ধিমত্তায় চিরকালই পরীক্ষার্থীদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন, এটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করুন।
যা ভালো পারেন তা গুছিয়ে লিখুন। সরাসরি জানা নেই কিন্তু সাধারণ ধারণা আছে এমন উত্তর লেখার ক্ষেত্রে জানাটুকু সুন্দর উপস্থাপন করুন, নিজের কম্ফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে ভুলভাল লিখে ফেঁসে যাবেন না। যে বিষয়ে একেবারে ধারণাই নেই তা সম্পর্কে অপ্রাসঙ্গিক কল্পকাহিনী লিখে খাতাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবেন না। শুধু চোখ ধাঁধানো রঙের ব্যবহার ও সুন্দর হাতের লেখায় পরীক্ষকের মনভোলানো যাবে না, লেখায় বস্তুনিষ্ঠতা ও ভাষায় মান থাকতে হবে।
পরীক্ষকদের সামর্থ্যকে সম্মান করুন। তাদেরকে ফাঁকি দেয়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁরা একটি খাতাতে চোখ বুলানোর দ্বারাই লেখার মান সম্পর্কে অনেকটা ধারণা করে ফেলতে পারেন। অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর হওয়ায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়েই চাকুরির পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করা হয়। বিসিএস লিখিত পরীক্ষার খাতা দুই পরীক্ষক এবং ক্ষেত্র বিশেষে তিন পরীক্ষক দেখছেন। এমনও হতে পারে চতুরতা করে নাম্বার পাওয়ার লোভে আপনি এমন এক খাপছাড়া বাক্য/অনুচ্ছেদ লিখলেন যা পড়ে পরীক্ষকের মনে আপনার ব্যাপারে বিরূপ ধারণা জন্মে গেল। ব্যস, পরীক্ষককে বিব্রত করার কারণে অত্যন্ত সুচারুভাবে উপস্থাপিত হলেও আশঙ্কা করা যায় যে খাতার বাকি অংশটুকুতে আশানুরূপ নাম্বার পাবেন না।
মনে রাখবেন পরীক্ষকগণের মাঝেও আবেগজনিত প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক। অবান্তর ও বিভ্রান্তিকর লেখা লিখেে তাঁদের মূল্যবান সময় নষ্ট করলে তাঁদের মেজাজে এর প্রভাব পড়তেই পারে। নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা থেকে বিরত থেকে পরীক্ষার খাতায় অর্জিত জ্ঞান প্রতিফলিত করুন। গ্রামে একটা কথা বলে, "খুদ খেয়ে পেট নষ্ট করতে নেই"।

Comments

Popular posts from this blog

জিরো কুপন বন্ড কী? এইটা কিভাবে কাজ করে?

ব্যাংক ভাইবা - মোঃ ইউসুফ আলী

১ম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা-- আল-আমিন আহমেদ