ডিজিটাল বাংলাদেশ: ভাবনা হোক গ্রামীণকেন্দ্রিক - (দৈনিক শেয়ার বিজ - ১৬/১২/২০২০)
ইসরাত জাহান
চৈতী: ২০১৮ সাল থেকে প্রতিবছর ১২ ডিসেম্বর পালিত হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস। তথ্য ও
যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের উদ্যোগে সারা দেশে বিভিন্ন কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে
পালিত হয় দিবসটি। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রূপকল্প
২০২১’ বাস্তবায়নের যে ঘোষণা দেওয়া হয় তার শিরোনাম ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ। এ ইশতেহারে
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে একটি ডিজিটাল দেশে রূপান্তরের অঙ্গীকার করে। তারই ধারাবাহিকতায়
২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সরকার দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের ঘোঘণা দেয়।
প্রথমবার দিবসটি আইসিটি বা তথ্য যোগাযোগ দিবস নামে উদ্যাপিত হলেও পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮
সালে দিবসটির নাম পরিবর্তন করে ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবছর
ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে ১২ ডিসেম্বর জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি উদ্যাপন
করে থাকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর। দিবসটি উদ্যাপন উপলক্ষে শেখ রাসেল ডিজিটাল
ল্যাব সারা বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ
প্রযুক্তি অধিদপ্তর ও ইয়াং বাংলার যৌথ উদ্যোগে অনলাইন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার আয়োজন
করা হয়ে থাকে।
‘যদিও মানছি
দূরত্ব, তবুও থাকছি সংযুক্ত’ এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ চতুর্থবারের মতো এ বছর আয়োজিত হতে
চলছে ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস। অন্যান্য বছরের মতো এবারও দিনের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে
পুষ্পস্তবক অর্পণ করার মাধ্যমে শুরু হবে দিবসটি উদ্যাপন। ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস উপলক্ষে
দেশের সব জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে।
এতে করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ দিবসটি সম্পর্কে অবগত হন। মূলত বাংলাদেশকে একটি ডিজিটাল
দেশে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যেই এই আয়োজন।
বাংলাদেশকে
একটি ডিজিটাল দেশে রূপান্তরিত করতে চলছে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন
পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে এরই মধ্যে, যার দরুন দেশ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের
দ্বারপ্রান্তে। দেশের সর্বস্তরে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলমান। ফলে ডিজিটাল
সেবার আওতায় আসবে সবাই। বর্তমান সময়ে দেশে বেড়েছে ইন্টারনেটের ব্যবহার। বিআরটির
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ৯ কোটি পাঁচ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যা
আগের চেয়ে অনেক বেশি।
দেশে এখন সব
ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয় অনলাইনে। আগে কোনো খবর দেশের এক জায়গা থেকে অপর জায়গায়
পৌঁছাতে সময় লেগে যেত চার-পাঁচ দিন, কোনো কোনো সময় লাগত আরও বেশি। কিন্তু বর্তমানে
ঘরে বসেই দুনিয়ার সব প্রান্তের খবর মুহূর্তেই পাওয়ায় ডিজিটাল মাধ্যমগুলো ব্যবহার
করে। কয়েক বছর আগের কথা, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফরম বা চাকরির ফরম উত্তোলনের জন্য
এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে হতো। এতে প্রচুর শ্রম ও সময়ের অপচয় হতো। এখন আর তা
করতে হয় না। ঘরে বসে এ কাজ করতে প্রয়োজন হয় একটি স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট
সংযোগ। এছাড়া অনলাইন কেনাকাটা, পণ্য পৌঁছানোর সুবিধা, মোবাইল ব্যাংকিং, মানি ট্রান্সফার,
অনলাইনে ভ্রমণ টিকিট কাটা, ই-ট্রেন্ডিং, অনলাইন ব্যাংকিং, অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম,
টেলি মেডিসিন সেবা, বাণিজ্য, কৃষি, সতর্কবার্তা প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই বৃদ্ধি পেয়েছে
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, যা অতীতে ছিল কল্পনার মতো। এরই মধ্যে দেশের নাগরিকদের প্রদান
করা শুরু হয়েছে ডিজিটাল ভোটার আইডি কার্ড, ই-পাসপোর্টসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সেবা।
এসব সেবা বাংলাদেশকে ডিজিটাল দেশে রূপান্তরের একেকটা ধাপ।
ব্যাপকহারে
ডিজিটাল সেবা চালু হলেও দেশের সব স্তরে সেটা পৌঁছানোর নিশ্চয়তা প্রদান করাও জরুরি।
এখনও দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই এতসব ডিজিটাল সেবা সম্পর্কে অবগত নন। ক্ষেত্রবিশেষে
তারা জানেন না বাজারে না গিয়ে অনলাইনে দ্রব্য ক্রয় করা ও বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা
ঘরে বসে ভোগ করা যায়। আবার ঘরে বসেই যে চিকিৎসাসেবাও গ্রহণ করা যায়, সে সম্পর্কেও
অনেকে অবগত নন, সেবা গ্রহণ তো দূরের কথা। শুধু দু-একটি বিষয় নয়, ডিজিটাল সেবার সুবিধাগুলোর
অধিকাংশই এখনও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে। তাই তো দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এসব
সেবা সম্পর্কে ঠিকমতো জানেও না।
কভিডের এই সংকটকালে
যেখানে দেশের প্রায় সব কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে অনলাইনে চিকিৎসাসেবা থেকে শুরু করে
শিক্ষাসহ সবকিছু, সেক্ষেত্রে দেশের সব গ্রামে বা উপজেলায় অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা
করা যেন কঠিন ব্যাপার। এর ফলে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যাচ্ছে শহরের শিক্ষার্থীদের
তুলনায়। একটু দৃষ্টি দিলেই দেখা যায়, কভিডের এই সংকটকালে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
বন্ধ হয়ে গেলেও শহরের স্কুলগুলো অনলাইনে চালাচ্ছে তাদের কার্যক্রম। এছাড়া প্রাইভেট
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিকই তাদের শিক্ষাবর্ষ চালিয়ে যাচ্ছে বাধাহীনভাবে, কিন্তু ন্যাশনাল
ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন ক্লাস চালু করলেও সে সেবার আওতাভুক্ত নয় সব শিক্ষার্থী।
এর পেছনে বড় কারণ পাবলিক ও ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী গ্রামীণ
পর্যায় থেকে উঠে আসা। তাদের পক্ষে বেশি দামে ইন্টারনেট কিনে ক্লাস করা অনেক সময়ই
অসম্ভব। আবার ক্লাস করার জন্য যেসব ডিভাইস প্রয়োজন সেসবেও রয়েছে ঘাটতি। যদিও সরকার
এ বিষয়ে গ্রহণ করেছে কিছু উদ্যোগ, তবুও প্রয়োজনের তুলনায় সেসবে রয়েছে ঘাটতি।
কার্যকর কিছু
পদক্ষেপের মাধ্যমেই এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব, যেমন দেশের সব পর্যায়ে দ্রুত গতির
ইন্টারনেট সেবার ব্যবস্থা করা, ইন্টারনেটের মূল্য হ্রাস করা, ডিজিটাল ডিভাইসের উচ্চ
মূল্য হ্রাস করা, গ্রামীণ জনগণকে ডিজিটাল সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণ দেওয়া প্রভৃতি।
বর্তমান সরকার সব শ্রেণিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে। এতে
সব স্তরের মানুষ ডিজিটাল সেবা সম্পর্কে সচেতন হবে বলে আশা করা যায়। গ্রামীণ পর্যায়ে
তরুণদের কম্পিউটারবিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, ডিজিটাল সেবাগুলো গ্রামীণ
জনগণের জন্য সহজলভ্য করা প্রভৃতি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই সবার সমান সুযোগ-সুবিধা
নিশ্চিত হতে পারে। ডিজিটাল সেবায় যাতে বৈষম্যের স্বীকার না হয় দেশের কোনো মানুষ এবং
দেশের সব মানুষকে সমানতালে ডিজিটাল সেবা ভোগ করার সুযোগ নিশ্চিত করাই হোক ডিজিটাল বাংলাদেশ
দিবসের মূল ভাবনা। তবেই সার্থক হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
শিক্ষার্থী
জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়
Comments
Post a Comment