অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে কিছু সুপারিশ - ড. মো. আবুল কাসেম (দৈনিক বণিক বার্তা - ১৫/১২/২০২০)

আমরা সবাই বাংলাদেশের উন্নয়ন চাই এবং সবার জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচনেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। গত কয়েক দশকে দেশের আর্থিক উন্নয়ন বেশ ভালোই হয়েছে, যা পরিষ্কার বার্ষিক জাতীয় জিডিপি বৃদ্ধির হিসাব থেকে। তবে হ্যাঁ, পাশাপাশি সমাজে আয়বৈষম্যও বেড়েছে; যেহেতু দেশের জিডিপির বৃদ্ধি মূলত ধনী সম্প্রদায়ের। তার অর্থ, দেশের বর্তমান অর্জিত আর্থিক উন্নয়নের সঙ্গে বৈষম্য হ্রাস করতে পারলেই দারিদ্র্য বিমোচনের গতিও ত্বরান্বিত হতো। সুতরাং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় দারিদ্র্য দূরীকরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সেদিকে লক্ষ রেখেই বর্তমান ছোট লেখাটি। শুরুতেই তাই যা স্মরণীয় তা হলো, দেশের সাধারণ জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সারা দেশে উন্নয়ন বিনিয়োগ জরুরি। সে উদ্দেশ্য পূরণে প্রথমেই দেশের বিকেন্দ্রীকরণ অত্যাবশ্যক এবং তাই শুরুতেই বাংলাদেশকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করতে হবে এবং বর্তমান আটটি বিভাগই প্রাদেশিক সরকার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তার জন্য রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার কিছুটা পরিবর্তন জরুরি। উল্লেখ্য, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ২৯টি রাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে ৫০টি, এমনকি চার কোটি মানুষের দেশ কানাডাকেও নয়টি রাজ্যে ভাগ করা হয়েছে। এমনটা করা হয়েছে জনগণের কল্যাণেই।

 

প্রাদেশিক সরকারের মাধ্যমে কীভাবে বাংলাদেশের দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব, তারই সক্ষিপ্ত চিত্র নিম্নে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে সারা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও তত্লক্ষ্যে পুরো দেশের বিনিয়োগ অনেকটা রাজধানী শহর ঢাকাকে কেন্দ্র করে হয়। সে উদ্দেশ্য পূরণ করতে গিয়ে ঢাকা বর্তমানে দুর্বিষহ শহরে রূপান্তরিত হচ্ছে, যেহেতু সারা দেশের সব লোকের সমাগম হচ্ছে ঢাকায়; ওদিকে সবকিছুর কেন্দ্র ঢাকা শহর প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার পর ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ের সিদ্ধান্ত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক। ফলে প্রতি বছর নতুন কয়েক লাখ লোকের সমাগম ঘটছে ঢাকায়। কাজেই সেখানে দ্রুত সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধিতে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। আর ওদিকে রাজধানী শহরে বাড়িঘরের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ চাহিদাও বাড়ছে। ফলে পরিবেশদূষণের মাত্রা সীমা অতিক্রম করেছে। দেশের বিকেন্দ্রীকরণ হলে ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা প্রথম বছরেই কমপক্ষে ২৫-৩০ লাখ হ্রাস পাবে। তাতে বর্তমান সুযোগ-সুবিধাতেই ঢাকা শহর একটি নিরাপদ উন্নত শহরে রূপান্তরিত হবে এবং এখানে বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব; যেহেতু নদী ও বায়ুদূষণ হ্রাস পাবে। এবার দেখা যাক প্রস্তাবিত রাষ্ট্রের বিকেন্দ্রীকরণে প্রাদেশিক শহরসহ আঞ্চলিক উন্নয়ন কীভাবে এবং কোন দিকে গড়াবে।

 

দেশে বিকেন্দ্রীকরণের ফলে প্রথমেই আঞ্চলিক নেতাদের উন্নয়ন দিকদর্শন অনেকটা নিজস্ব অঞ্চলমুখী হবে এবং তারা আর অতটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী হবেন না এবং স্থানীয় প্রশাসনিক ও সামাজিক উন্নয়ন বিনিয়োগ দেশের প্রস্তাবিত আটটি প্রাদেশিক সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হবে। প্রাদেশিক সরকার তাদের নিজ নিজ এলাকার সব প্রয়োজন নিজেরাই সমাধান করতে অধিকতর সচেষ্ট হবে। সুতরাং প্রাদেশিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তখন খানিকটা ভিন্নতর হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে সুবিধা আমার দৃষ্টিতে পড়ে তা হলো, প্রাদেশিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় দায়িত্বপ্রাপ্তকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দেশের প্রধানমন্ত্রী ও তার ঘনিষ্ঠ জনদের মুখাপেক্ষী থাকতে হচ্ছে না। তারা তখন নিজেদের এবং এলাকার বিভিন্ন দাবি অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পও স্থানীয় দাবি পূরণে সক্ষম হবে।

 

ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এলাকায়। দুর্নীতি করার সুযোগও হ্রাস পাবে, যেহেতু স্থানীয়ভাবে অনেকেই অনেককে জানে-শুনে। আমার আশা, তখন প্রশাসন ব্যবস্থারও উন্নতি হবে। ওদিকে প্রাদেশিক রাজধানীর উন্নয়নে ও অবকাঠামোগত বিবিধ কর্মকাণ্ডে নতুন কর্মের সৃষ্টি হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের নানা পরিবর্তন আসবে। তখন তারা নিজেদের প্রয়োজন ও দাবি অনুযায়ী প্রকল্প বাছাই করতেও সক্ষম হবে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ্য যে (ধরুন) খুলনার প্রাদেশিক সরকার প্রথমেই উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্ট সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস রোধ করতে পাকাপোক্ত একটি বাঁধ তৈরি করতে অধিকতর অর্থ বরাদ্দ করবে। একইভাবে এলাকার খাবার পানির ব্যবস্থায়ও অধিক মনোযোগ দেবে। একইভাবে রাজশাহী প্রাদেশিক সরকারও শুষ্ক মৌসুমে তার উঁচু এলাকায় জল সেচের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয়সংখ্যক গভীর নলকূপ স্থাপন ও খাল খননে প্রয়োজনীয় মনোযোগ সক্ষম হবে। ওদিকে আবার রংপুর প্রাদেশিক সরকার মরিয়া হয়ে নদীভাঙন রোধে অধিক পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করার চেষ্টা করবে।  মোদ্দাকথা, স্থানীয় প্রয়োজন মেটাতে প্রাদেশিক সরকার উঠেপড়ে লাগবে বলে মনে করছি। ফলে সারা দেশে উন্নয়ন গতি বৃদ্ধি পাবে।

 

কেন্দ্রীয় সরকার তখন দেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বর্তমান ৩৪ লাখ মামলার জট হ্রাস করতে বেশ কয়েকশ বিচারকসহ অনেক সহযোগী কর্মকর্তাও নিয়োগ করবে বলে মনে করছি। পাশাপাশি জনগণের কষ্ট হ্রাস করতে প্রাদেশিক রাজধানীতে হাইকোর্ট স্থাপনেও উদ্যোগ নেবে বলে মনে করছি। আসলে দেশের বিচার ব্যবস্থাসহ কেন্দ্রীয় সরকারের মূল দায়িত্ব হবে দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ে অধিকতর মনোযোগ দেয়া এবং পরবর্তী ধাপে বৈদেশিক কর্মসংস্থান, রাজস্ব বিষয়সহ গ্যাস উত্তোলন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন, পাহাড়, নদী ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ইত্যাদি অগ্রাধিকার পাবে। ওদিকে সারা দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ইত্যাদির আধুনিকায়ন প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্ব। উন্নয়নের এসব ক্ষেত্রে প্রত্যেক প্রদেশে সব উদ্যোক্তার মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিভিন্ন সার্ভিসের বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অবশ্যই মানেরও উন্নতি ঘটবে। ওদিকে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার মাত্রায় পরিবর্তন হলে জাতীয় নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসবে। স্থানীয় সব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

 

কেন্দ্রীয় সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়নে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় প্রয়োজনীয় আধুনিক বিশেষায়িত বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলবে। দেশী-বিদেশী শিল্পপতি ও বিত্তবানরাও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে এগিয়ে আসবে, তখন বৈদেশিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যে পরিবর্তন আসবে। সেজন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ জরুরি মনে করি। ওদিকে প্রবাসে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের নতুন কর্মসংস্থান ও তাদের সার্বিক সুবিধা সৃষ্টিতেও কেন্দ্রীয় সরকারকেই দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং বৈদেশিক দূতাবাসকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে। এখানে অবশ্যই স্মরণীয়, বাংলাদেশ অত্যন্ত জনবহুল দেশ বিধায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসংস্থানে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক উভয় সরকারকেই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমেই দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়নে অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে।

 

সংক্ষেপে যা উল্লেখ্য তা হলো, ১৭ কোটি মানুষের বাস যে বাংলাদেশে এবং যেখানে প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি শিশু প্রাইমারি স্কুলেই ভর্তি হচ্ছে, তার মধ্য থেকে প্রতি বছর চার-পাঁচ লাখ উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী ও যোগ্য যুবক-যুবতী অবশ্যই বের হেয় আসবে, যারা প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন। প্রয়োজন শুধু দেশে উপযুক্ত কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। দেশে প্রস্তাবিত আটটি প্রাদেশিক সরকার নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশকে অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত উন্নত একটি দেশ গড়তে সক্ষম।

 

 

 

ড. মো. আবুল কাসেম: বিআইডিএসের সাবেক সিনিয়ার রিসার্চ ফেলো

Comments

Popular posts from this blog

জিরো কুপন বন্ড কী? এইটা কিভাবে কাজ করে?

ব্যাংক ভাইবা - মোঃ ইউসুফ আলী

১ম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা-- আল-আমিন আহমেদ