লকডাউন ও ভাষাগত দার্শনিক চ্যালেঞ্জ - কৌশিক বসু (দৈনিক বনিক বার্তা - ১৪/১২/২০২০)


 

কভিড-১৯ লকডাউনশব্দটি ঘিরে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জীবন সুস্থ থাকার বিষয়গুলোয় ভাষার শক্তিশালী প্রভাবকে স্পষ্ট করে। অনন্ত বৈচিত্র্যে ভরা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের ভাণ্ডারে থাকা নির্দিষ্টসংখ্যক শব্দ আর বাক্যগুলো ভাবনা অনুভূতিকে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অনিবার্য এক দার্শনিক চ্যালেঞ্জের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কোনো ব্যক্তির ব্যবহার করা শব্দগুলো ঘিরে তার রাজনৈতিক আদর্শের সংকেত হিসেবে বিবেচনার প্রবণতা চ্যালেঞ্জটিকে আরো বেশি মাত্রা যোগ করে।

 

মহামারী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ নীতি-আলোচনাই লকডাউন ঘিরে আবর্তিত। সংক্ষেপে বিষয়টিকে দুই ধরনের প্রশ্ন দিয়ে সাজানো যায় (আমাদের কি লকডাউনে যাওয়া উচিত, নাকি নয়?) কিংবা একটি প্রশ্নের মধ্যে নিয়ে আসা যায় (কতটা সময়ের জন্য আমাদের লকডাউনে যাওয়া উচিত?), লকডাউনের জটিল সমস্যাকে এভাবে সহজীকরণ করা যেতে পারে।

 

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলোর মধ্যে এক ধরনের দ্বৈত প্রবণতা স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অল্প আগে আইওয়া ক্যাম্পেইন র্যালির সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘আপনাদের বন্দি করে বাইডেন মূলত আমেরিকাকে বন্দি রাষ্ট্রে পরিণত করে ছাড়বেন।তিনি শুধু একথা বলেই ক্ষান্ত হননি, ‘বাইডেন চান আমাদের রাষ্ট্রকে লকডাউন করে দিতে, সম্ভবত কয়েক বছরের জন্য। মাথা খারাপ! লকডাউনের কোনো ঘটনাই এখানে ঘটবে না’—লিখেও টুইট করেন।

 

কভিড-১৯ নীতি বিতর্ক ঘিরে ট্রাম্পের নির্লজ্জ রাজনীতিকরণ বামধারার দলগুলোকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কারণ প্রেসিডেন্টের বিপরীতে তারা বিজ্ঞানকে গ্রহণ করেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই লকডাউনের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ের সমর্থন করেছে।

 

লকডাউন বিতর্ককে সরলরৈখিকভাবে দেখাটাও কিন্তু সমান সমস্যাযুক্ত। যেমন কোনো রেস্তোরাঁর মেনুতে লেখা আছে, ‘আপনার খাবারটি শূন্য থেকে দশ মাত্রার মধ্যে কতটা লবণাক্ত হবে।মেনু অনুসারে খাবার অর্ডার করার পর এক্ষেত্রে বড় ধরনের গণ্ডগোল ঘটবে। কারণ যে ক্রেতা মাত্রার লবণ দিতে বলেছেন, তিনি একটি নোনতা মিষ্টান্ন পাবেন এবং যারা কিনা শূন্য মাত্রার লবণের কথা বলেছেন (কারণ তারা পুডিং অর্ডার করেছেন), তারা স্বাদহীন পিত্জা খেতে গিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করবেন।

 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাস্তব দুনিয়ার মহামারী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পরিস্থিতি সাদৃশ্যপূর্ণ, বিশেষ করে যেখানে নীতির হাজারটা মাত্রিকতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পানশালাগুলো বন্ধ রেখে সরকার বিদ্যালয় খুলে দিতে পারে কিংবা যারা মাস্ক পরবে না, তাদের ঘরেই অবস্থান করতে বলবে, বিপরীতে যারা মাস্ক পরবে, তাদের বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেবে। দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সামাজিক দূরত্বের বিধিবিধান পরিপালনে বাধ্য করতে পারে এবং যারা কভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন, তাদের ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস করা যেতে পারে। তথাকথিত নন-ফার্মাসিউটিক্যাল পদ্ধতি আরোপ করার সময় বাছাইয়ের বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করা বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

এমনকি কভিড-১৯-এর ভৌগোলিক অবস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্যাটার্নের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়া হয়নি। ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার ভৌগোলিক পার্থক্য, আফ্রিকা, এশিয়া ওশেনিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও ভৌগোলিক পার্থক্য বিদ্যমান। অবস্থায় সংক্রমণ মৃত্যুর সংখ্যার জন্য এককভাবে নীতির ওপর দোষ চাপানো যায় না।

 

উদাহরণস্বরূপ, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে যদি তার দেশের অশোধিত মৃত্যুহারের (সিএমআর) সঙ্গে তুলনা করেদেশটিতে কভিড-১৯-এর কারণে প্রতি লাখে মৃত্যুর সংখ্যা ৭৬, স্পেনে সংখ্যা ৯৬৪কভিডে মহামারী মোকাবেলার নীতির সাফল্যের বিষয়টিকে নিয়ে গর্ব করে, তাহলে তা খানিকটা কপটই হবে। ন্যায়সংগতভাবে এটা বলাও ভুল হবে যে কভিড-১৯ প্রতিরোধে আমেরিকান নীতি ব্যর্থ হয়েছে। কারণ দেশটির সিআরএম ৮২৭, অথচ তুলনামূলক গরিব রাষ্ট্র ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে যা শূন্য দশমিক ৪।

 

ভৌগোলিক অবস্থান খুবই স্পষ্ট। কারণ এখানে অতীত-অসুস্থতা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া, ইকোলজি এবং অন্যান্য বিষয়, যেগুলো এখনো আমরা চিহ্নিত করতে পারিনি, সেসব  সম্পর্কিত ব্যাখ্যা থাকতে হবে। কভিডবিষয়ক নীতিগুলো কতটা কাজ করছে বা এর প্রভাব দেখতে হলে আমাদের আঞ্চলিক তুলনায় যেতে হবে (সম্প্রতি আমি যেমন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের যৌথ একটি গবেষণাপত্র সম্পর্ক ভিন্ন মত পোষণ করেছি।) ভারতের অভিজ্ঞতাও লকডাউনের শাব্দার্থিক ঝুঁকির কথা বলে। ২৪ মার্চ ভারতের সরকার লকডাউনের ঘোষণা দেয়। ধারণা করা হয়, যা ইউরোপের দেশগুলোর লকডাউনের তুলনায় কঠোর ছিল, কেননা দেশটি অনেক বেশি কড়াকড়ি আরোপ করে। তবে সপ্তাহ দুয়েক পরে নীতি নিয়ে সমস্যাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ দেশটির দরিদ্র অভিবাসীদের জন্য কোনো বিধিবিধানের ব্যবস্থা না রাখায় তারা কোনো ধরনের কাজ বা মজুরি ছাড়াই শহরে আটকা পড়ে, এক পর্যায়ে শত শত মাইল পথ পায়ে হেঁটে নিজ গ্রামে পৌঁছানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না। সুতরাং ভারতের শহর, উপশহর অর্থনীতি লকডাউন করা হলেও ২৩ থেকে ৪০ মিলিয়ন অভিবাসী শ্রমিকের জন্য তা ছিল সম্পূর্ণই বিপরীত এক পরিস্থিতি। তাদের জন্য এটাকে বরংগ্রেট আনলকিংবা চরম মুুক্তাবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

 

ওই ভুল পদক্ষেপের প্রভাব পরিসংখ্যানগুলোয়ও স্পষ্ট। ছয় মাস ধরে প্রতিদিন ভারতে কভিড-১৯- আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। অনেক দেশেই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়নি। ভারতের বর্তমান ৯৯ সিএমআর এখন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ (আফ্রিকার বেশির ভাগ দেশের চেয়ে বেশি) কারণ তাদের ক্ষেত্রে লকডাউন জারি করা মূলত নভেল করোনাভাইরাসকে মুক্ত করেছে এবং দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে।

 

অতীত নিয়ে আক্ষেপ করার পরিবর্তে আমাদের বরং সামনে অগ্রসর হতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না কভিড-১৯-এর নিরাপদ কার্যকরী টিকা সহজলভ্য হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হবে। সীমিত করতে হবে আচরণ বিধি লকডাউন। এক্ষেত্রে পুলিশ নিয়োগ করার  চেয়ে বরং স্থানীয় নেতৃত্ব প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা উচিত।

 

পর্যায়ে একটি পরামর্শ দিচ্ছি। আমাদের এমন লোকেদের ওপর নির্ভর করা শুরু করতে হবে, যারা কভিড-১৯- আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠেছে। কভিড-১৯-এর সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনকারীদের আকর্ষণীয় বেতনে ওই ধরনের চাকরিতে রাখা যেতে পারে, যে কাজে সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সংস্পর্শে আসার প্রয়োজন পড়ে। পদ্ধতিতে সরবরাহ শৃঙ্খলা উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতি চালু রাখা সম্ভব হবে।

 

সরকারগুলো একবার নেতৃত্ব দিলে বাজার চালিকা শক্তিগুলোও চালু হবে এবং কাজ করা শুরু করবে। ব্রুকিংস গবেষণাপত্রে আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে পদ্ধতি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। কিন্তু প্রচুর সম্ভবনা রয়েছে। কেননা যে অর্থনীতিগুলো একটি কার্যকরসুরক্ষিত শ্রম বাজারতৈরি করতে পারবে, তারা বড় ধরনের সুবিধা নিতে পারবে।

 

শেষ হয়েছে মার্কিন নির্বাচন। সেখানে লকডাউনবিষয়ক বিতর্ক ঘিরে আগের তুলনায় পরিস্থিতি নমনীয় বলে মনে হয়। উৎসাহজনকভাবে, বাম সমর্থকদের অনেকেই সীমিত আকারে লকডাউন জারি আচরণ বিধির ওপর সামান্য নিয়ন্ত্রণ আরোপের পক্ষে, যা অর্থনীতি খোলার পাশাপাশি সামাজিক বিষয়গুলোকেও সমর্থন করে। ধরা যাক ট্রাম্প, যিনি কিনা দৃঢ়ভাবে কোনো প্রকারের লকডাউন আরোপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তিনি কিন্তু ২০২১ সালে ২০ জানুয়ারির পরে কোনোভাবেই নিজেকে আর হোয়াইট হাউজে বন্দি করে রাখতে পারবেন না। কভিড-১৯ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের বিষয়গুলো ততদিনে অবশ্য ঢেলে সাজানো হতে পারে।

 

[স্বত্ব:প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

 

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস


Comments

Popular posts from this blog

জিরো কুপন বন্ড কী? এইটা কিভাবে কাজ করে?

ব্যাংক ভাইবা - মোঃ ইউসুফ আলী

১ম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা-- আল-আমিন আহমেদ