কভিড-১৯: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং আগামীর পুঁজিবাজার - ড. মিজানুর রহমান (দৈনিক বণিক বার্তা - ১৬/১২/২০২০)
বাংলাদেশ এশিয়ার একটি উদীয়মান বাজার অর্থনীতি। দেশটির প্রকৃত অর্থনীতি ১৯৯১ সাল থেকে প্রায় পাঁচ গুণ প্রসার লাভ করেছে। পাঁচ বছরের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১৯৯১-৯৫ সালে ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে ২০১৫-১৯ সালে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ক্রমে হ্রাসের কারণে মাথাপিছু জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার অপেক্ষা ত্বরান্বিত হয়েছে। গত দশকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুধু অসাধারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উপহার দেননি, পাশাপাশি তার সুযোগ্য নেতৃত্বে সরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ অর্থনীতির বিভিন্ন ভঙ্গুরতা সূচকগুলো কমিয়ে আনতে সফল হয়েছে।
ফলে দেশটি ২০১৮
সালে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণের জন্য যে তিনটি শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা পূরণ
করেছে এবং ২০২৪ সালের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে একটি উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করবে। মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ভিশন-২০২১ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সাফল্যের
সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছিলেন এবং তার সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে একটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য
অর্জনে অগ্রসর হচ্ছিল, তখনই অপ্রত্যাশিতভাবে নভেল করোনাভাইরাস থেকে সৃষ্ট মহামারীতে
বিশ্বব্যাপী জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্তিমিত হয়ে পড়ে। বিশ্ব অর্থনীতি এখনো দীর্ঘমেয়াদি
মন্দার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
কভিড-১৯-এর
কারণে বিগত দশকের অনেক উন্নয়ন অর্জন ম্লান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। নজিরবিহীন
এই বৈশ্বিক মহামারী মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
২০২০ সালের মার্চের প্রথম দিকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
সহায়তায় আর্থিক প্রণোদনার অংশ হিসেবে ‘টার্গেটেড ঋণ কর্মসূচি’ নামে প্রায় ২০টি কর্মসূচি
চালু করেছেন। সম্মিলিতভাবে ওই ঋণ কর্মসূচির মূল্য বর্তমানে ১৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
প্রকল্পগুলো রফতানিমুখী ব্যবসা, বড় করপোরেশন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, কৃষি ও পেশাদারদের
জন্য পৃথক পৃথকভাবে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে
তারল্যের জোগান নিশ্চিত করা, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কভিড-১৯ মহামারীজনিত
অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি মোকাবেলা করতে পারে। তদুপরি, ২০২০-২১ অর্থবছরের ৭১ বিলিয়ন ডলারের
সরকারের আর্থিক ব্যয়ের পরিকল্পনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও সামাজিক
নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী
আ হ ম মুস্তাফা কামাল ব্যবসায় ও ব্যক্তি পর্যায়ে সহায়তার জন্য ব্যাপকভাবে আর্থিক প্রণোদনার
প্রস্তাব করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জননীতির (পাবলিক পলিসি) লক্ষ্য
হিসেবে সুদহারকে একক অংকের মধ্যে রাখা হয়েছে। এই উদ্দীপনামূলক স্কিমগুলোর কাজ দ্রুত
বাস্তবায়ন চলছে এবং পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ঋণ ও তারল্য প্রবাহ নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও একটি সমন্বিত মুদ্রানীতি কার্যকর করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপোর হারকে
১২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪ শতাংশ ও টি-বিলের সুদহারকে ২০০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৫ দশমিক
৫৫ শতাংশে নামিয়েছে। আমার মতে, মুদ্রানীতির এই পরিবর্তন খুব দ্রুত হয়েছে এবং এটি একটি
কার্যকর সিদ্ধান্ত ছিল।
বাংলাদেশের
অর্থনীতির সংকট উত্তরণের প্রাথমিক লক্ষণ প্রতীয়মান হচ্ছে। কলকারখানাগুলো আবার চালু
হয়েছে। রফতানি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীরা কারখানায় ফিরেছেন। দেশজুড়ে
ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে
অনেক অর্থনৈতিক আশঙ্কা দূরীভূত হয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বিশেষজ্ঞরা সীমাহীন চলতি
হিসাবের ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কা করেছিলেন, যা বাস্তবে হয়নি। বর্তমানে চলতি হিসাবের ঘাটতি
৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের তুলনায় কম। দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহের
ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত বছর বাংলাদেশ ১৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স
অর্জন করেছে। ২০২০-২১ সালে অর্থমন্ত্রীর সৃজনশীল আর্থিক নীতি ও কর্মপরিকল্পনায় বাংলাদেশে
বৈদেশিক মূলধনের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনাকালীন প্রতি মাসের শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক
বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের নতুন নতুন রেকর্ড গড়েছে। নভেম্বর ২০২০ শেষে রিজার্ভের পরিমাণ
এখন ৪১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি অর্থ ব্যবস্থায় তারল্যের
পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করবে।
বাংলাদেশের
অবস্থা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে ভালো। আগামী ১৮-২৪ মাসে জিডিপির ১০-২০ শতাংশ
আর্থিক ঘাটতি মেটানোর সক্ষমতা অছে বাংলাদেশের। মহামারী অনিশ্চতার কারণে সরকারের আয়-ব্যয়
পরিকল্পনার বিরাট বৈষম্য দেখা দেবে। এটি সরকারের জন্য একটি কঠিন সমস্যা নয়। বাংলাদেশের
ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৩৫ শতাংশ, যার মাত্র ১৮ শতাংশ বৈদেশিক দেনা। সার্বভৌম রেটিং এজেন্সির
বিবেচনায় এটি নগণ্য। এটি সত্য যে কভিড-১৯ আমাদের সামগ্রিক চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
পারিবারিক ব্যয়, প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ, সরকারের ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ পণ্যে নিট
বৈদেশিক ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। দেশব্যাপী লকডাউন, শ্রমিকদের যাতায়াত সমস্যা, বৈদেশিক সরবরাহ
ব্যবস্থা বিঘ্ন ঘটার কারণে সামগ্রিক জোগান সীমিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু সরকারের দূরদর্শী
আর্থিক ও মুদ্রানীতির কারণে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব
হবে।
২০২০ সালে করোনা
প্রাদুর্ভাবের প্রাক্কালে পুরো বাংলাদেশ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী
উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং আগামী বছর বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন
করতে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে নির্বাচনের ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে
উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার ঘোষণা দেন। তার পরিকল্পনা অর্জনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ
জিডিপি অনুপাত আগামী দশকে ১০ শতাংশ বাড়াতে হবে। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিলেন পুঁজিবাজার
হবে নতুন বিনিয়োগের বড় উৎস। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো অনুন্নত। পুঁজিবাজারে মূলধনের
পরিমাণ ২০১৯ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের ১২ শতাংশ ছিল। ভারতে এটি ৭৫ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে
৫৫ শতাংশ। এর মানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় সংস্কার এবং দীর্ঘস্থায়ী সক্ষমতা অর্জন
করা দরকার। এই পরিবর্তন আনার প্রত্যয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সালের মে মাসে নতুন
কমিশনের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করেন। নতুন কমিশন বাংলাদেশে একটি সুশাসিত, স্বচ্ছ ও গতিশীল
পুঁজিবাজার তৈরির জন্য ব্যাপক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, নীতি সংস্কার এবং কার্যকর পদক্ষেপ
গ্রহণে বদ্ধপরিকর। বিনিয়োগকারীরা আপাতদৃষ্টিতে বাজারে তাদের বিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন।
আমাদের স্টক
এক্সচেঞ্জে দৈনিক টার্নওভার ২০২০ সালের মার্চে ১০০ কোটিরও কম থেকে ২০২০ সালের অক্টোবরে
১ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে। আমাদের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে
কমিশন তার অংশীদার এবং অন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে। একটি সুশাসিত,
স্বচ্ছ ও গতিশীল মূলধন বাজার তৈরির জন্য নিম্নোক্ত দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন
করা যেতে পারে।
বিএসইসির সক্ষমতা
বৃদ্ধি: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা
বাড়ানোর জন্য মানবসম্পদ, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিচক্ষণ নিয়মবিধির ওপর কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে
বিএসইসির একটি নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বাস্তবায়নাধীন।
প্রাথমিক বাজারের
পরিচালনা: বিএসইসি স্টক এক্সচেঞ্জ এবং অন্যান্য মূলধন বাজার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে
কাজ করবে এবং একটি স্বচ্ছ ও সুশাসিত প্রাথমিক বাজার তৈরি করবে। জনগণের কাছে ঋণপত্র
ও ইকুইটি সিকিউরিটির ইস্যুসংক্রান্ত আইন ও বিধিগুলো পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, যাতে
সিকিউরিটিগুলো ন্যায্যমূল্য নির্ধারিত হয় এবং বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সুরক্ষিত
থাকে। এই কার্যধারায় নিরীক্ষক, নিরীক্ষা সংস্থাগুলো এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর
ভূমিকা সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বিধিবিধান ও প্রায়োগিক দিকগুলো কার্যকরভাবে বড় সংস্কার
করা হবে।
লেনদেন ব্যয়
হ্রাস: সেকেন্ডারি মূলধন বাজারের কার্যক্রম ধীরে ধীরে, তবে কঠোরভাবে সংস্করণ করা হবে।
বাংলাদেশের মূলধন বাজারে লেনদেনের ব্যয় (ব্যাপক অর্থে) বেশি।
একটি বিশেষ
কারণ, যা সিকিউরিটিতে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ এই ব্যয়ে ভূমিকা রেখেছে, তা হলো
মার্জিন লোন বাজারের হতাশাজনক অকার্যকারিতা। সাধারণত মার্জিন লোন বাজারটি হবে প্রায়
ঝুঁকিমুক্ত এবং স্বল্প ব্যয়সাধ্য। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এমনটা হয় না। আমরা স্টক
এক্সচেঞ্জ ও পুঁজিবাজার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করব, যাতে মার্জিন বিধিগুলো
শক্তভাবে প্রয়োগ করা হয়। ২০১০ সালের পর থেকে মূলধন বাজারের দূরবস্থা অনেকাংশে অতিরিক্ত
ঋণ গ্রহণ এবং সময়মতো মার্জিন নিয়ম প্রয়োগ না করার কারণে ঘটেছিল।
রিয়েল টাইম
প্রতিবেদন ও স্বচ্ছতা: একটি প্রযুক্তিনির্ভর এক্সটেনসিবল বিজনেস রিপোর্টিং ল্যাঙ্গুয়েজের
(এক্সবিআরএল) স্টক এক্সচেঞ্জ, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং অন্য বাজার মধ্যস্থতাকারীদের
জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো এবং মূলধন
বাজারের মধ্যস্থতাকারীরা এক্সবিআরএল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে রিয়েল টাইমে করপোরেট ফাইলগুলো
উপস্থাপন করতে পারবে। ইস্যুয়ার ও বাজার মধ্যস্থতাকারীরা যাতে ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল
রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএফআরএস), ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অব অডিটিং (আইএসএ)
ও কার্যকর করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডগুলো মেনে চলে, সেই উদ্দেশ্যে বিএসইসি ব্যাপকভাবে
বিনিয়োগ করবে।
বন্ড ও ডেরিভেটিভসে
নতুন বাজার: সরকার বন্ড ও ডেরিভেটিভসকে একটি বৈচিত্রপূর্ণ মূলধনি বাজার হিসেবে গড়ে
তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে
মূলধনের বাজারে চালিত হয়। বিনিয়োগকারীদের জন্য বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি
সুকার্যকরী ডেরিভেটিভ বাজার অপরিহার্য। অপশন, ফিউচার ও ডেরিভেটিভস ব্যবসায়ের সুসংগঠিত
বাজার হচ্ছে আধুনিক মূলধনের বাজারের জন্য একটি প্রয়োজনীয় উপাদান।
এটি চড়া বাজার
পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং মন্দা বাজার পরিস্থিতিতে সমর্থন হিসেবে একটি স্বয়ংক্রিয়
স্ট্যাবিলাইজারের মতো কাজ করে। এই কমিশন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য স্টক এক্সচেঞ্জ ও অন্যান্য
কৌশলগত অংশীদারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করবে।
মিউচুয়াল ফান্ড
ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা: ব্যক্তি ও পারিবারিক সঞ্চয়কারীরা পেশাদার
তহবিল পরিচালকদের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে পছন্দ করেন। এ লক্ষ্যে মিউচুয়াল ফান্ড উন্নত
ও উদীয়মান অর্থনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মিউচুয়াল ফান্ডগুলো
এই মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে। কমিশন মিউচুয়াল ফান্ডের বিধিগুলো পুনরায় সংজ্ঞায়িত করতে
মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালন সংস্থাগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত রয়েছে, যাতে তাদের বিনিয়োগের
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এবং রিপোর্টিংয়ের ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আমরা মিউচুয়াল
ফান্ডের অবাধ তারল্য, স্বল্প ঝুঁকি, স্বচ্ছতা ও ইউনিটধারীদের টেকসই রিটার্ন নিশ্চিত
করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর
প্রযুক্তিগত উন্নতি করা: পুঁজিবাজার সিকিউরিটির ক্ষেত্রে কারসাজিমূলক লেনদেন রোধ করতে
এবং বৃহত্তর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার নজরদারি সফটওয়্যার/সিস্টেমগুলোকে উন্নত করবে।
এ লক্ষ্যে বিএসইসি স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে তাদের ট্রেডিং প্লাটফর্ম, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট
সিস্টেম (ওএমএস) এবং একটি গতিশীল রিয়েল টাইম ট্রেড কার্যক্রম অবকাঠামোকে উন্নত করতে
পথ প্রদর্শন করবে। আশা করা হচ্ছে, আমাদের স্টক এক্সচেঞ্জগুলো তাদের পরিচালনায় গুরুতর
প্রশাসনিক সংস্কার এবং পর্যাপ্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। কোনো স্টক নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর
প্রমাণিত হবে না, যদি না স্টক এক্সচেঞ্জগুলো প্রযুক্তিগতভাবে প্রতিযোগিতামূলক, দক্ষ
মানবসম্পদের অধিকারী, কার্যকর বোর্ড কমিটি পরিচালনা এবং বোর্ড থেকে ব্যবস্থাপনার পৃথকীকরণ
হয়। আমরা ডি-মিউচুয়ালাইজেশনের আসল লক্ষ্যটি অনুসরণ করে যাব।
সিকিউরিটি আইনের
বর্ধিত তদারকি ও প্রয়োগ: সিকিউরিটিজ আইনের কার্যকর তদন্ত, তদারকি ও প্রয়োগ বিএসইসি
ও স্টক এক্সচেঞ্জের সক্ষমতার অংশ। বিএসইসির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো মানবসম্পদ ও অন্যান্য
সম্পদের জন্য নীতি-বিধান করেছে, যা এই মূল কাজগুলো সম্পাদন করবে।
এ লক্ষ্যে একটি
বড় পার্থক্য তৈরি করতে সিকিউরিটিজ আইনগুলোও অবিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো
যেন করপোরেট প্রশাসনের কোড এবং আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রকাশের বিধিগুলো মেনে চলে
তা নিশ্চিত করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সংস্থাগুলো সিকিউরিটিজ
আইন, করপোরেট প্রশাসনের কোড এবং রিপোর্টিং মানদণ্ডগুলোর সঙ্গে মেনে না চললে কঠোর জবাবদিহিতা
প্রয়োগ করা হবে।
সুদূরপ্রসারী
মুদ্রানীতি ও আর্থিক নীতি: মুদ্রানীতি, সুদহার ও করনীতিগুলো সরাসরি করপোরেট নগদ প্রবাহ
এবং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটির বাজারমূল্যকে প্রভাবিত করে। সুদহার, শেয়ারবাজারের
তারল্য এবং পোর্টফোলিওর গঠন গভীরভাবে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তাই মুদ্রানীতিতে যেকোনো
পরিবর্তন এসব ফলাফল এবং পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে। কর আইন পুঁজিবাজারের
জন্য অনস্বীকার্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্টক এক্সচেঞ্জে
তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার জন্য
কর প্রণোদনা আরো বৃদ্ধি করবে। তালিকাভুক্তিতে যাওয়ার জন্য মূলধন বাজারকে আকর্ষণীয় করে
তুলতে হবে এবং নীতিগুলো এ লক্ষ্যেই প্রস্তুত করা হবে।
আন্তঃসাংগঠনিক
সমন্বয়: সুশাসিত মূলধনি বাজারের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন,
বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-সহ মূল নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন
সমন্বয় প্রয়োজন। একটি আধুনিক পুঁজিবাজার তৈরির জন্য এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির
মধ্যে এই সমন্বয়কে গতিশীল করতে সরকার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বিবেচনা করতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের
জন্য আর্থিক সাক্ষরতা: বাংলাদেশে আর্থিক স্বাক্ষরতা খুব কম। বাংলাদেশ আর্থিক স্বাক্ষরতা
বাড়ায় কাজ করছে বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেট (বিএএসএম) ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট
অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম)। সরকার উভয় প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে এবং আর্থিক শিক্ষা
কার্যকর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পুঁজিবাজার
জটিল, ভবিষ্যত্মুখী এবং অনুমানমূলক। আর্থিক ও রাজস্ব নীতিগুলোর সঙ্গে পুঁজিবাজার গভীরভাবে
নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কীভাবে নতুন বিনিয়োগের বর্ধমান চাহিদা পূরণ হয়,
তার ওপর নির্ভর করবে। গতানুগতিক ব্যাংকভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা এ লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
নয়। একটি উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে বাংলাদেশকে রূপান্তর করার জন্য একটি সুশাসিত, স্বচ্ছ
ও অপেক্ষাকৃত দক্ষ মূলধন বাজার অগ্রণী প্রমাণিত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
এবং মাননীয় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালের সুযোগ্য নেতৃত্বে আমরা এই লক্ষ্য অর্জনে
প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
[এ নিবন্ধের
মতামত তার একান্ত ব্যক্তিগত এবং কমিশনের নয়। তথ্যগত ত্রুটি-বিচ্যুতি লেখকের ব্যক্তিগত
দায়।]
ড. মিজানুর রহমান: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের সদস্য
Comments
Post a Comment