রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

 রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (40thBCSWrtn)

ভূমিকা :

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ২ হাজার ৪ শত মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরিকল্পিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র যা রাজধানী শহর ঢাকা থেকে ২'শ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার অন্তর্গত পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর গ্রামে নির্মিত হচ্ছে । এটি বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে ২০২৩ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ১২০০ মেগাওয়াটক্ষমতা সম্পন্ন দুইটি ইউনিটে রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মান করা হবে। 

২রা নভেম্বর ২০১১ বাংলাদেশ ও রাশিয়া সরকারের মাঝে সম্পাদিত চুক্তির মধ্যে দিয়ে পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পর্কিত এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়ার সহায়তায় পাবনার রূপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চামেলী হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। রাশিয়ার পক্ষে চুক্তিতে সই করেন সে দেশের পরমাণু শক্তি করপোরেশন-রোসাটমের মহাপরিচালক সের্গেই কিরিয়েংকো। এর আগে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য অনুমোদিত হয়। ২০১৩ সালের অক্টোবরে রূপপুরে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় কোম্পানি গঠন করতে সংসদে বিল পাস হয়। আইন অনুযায়ী, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা থাকবে বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের হাতে।আর কেন্দ্রটি পরিচালনার দায়িত্ব পাবে ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ’।

চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে খরচ হবে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ লাখ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা)। স্বল্প সুদে এই অর্থের সিংহভাগেরই ঋণ দেবে রাশিয়া। কেন্দ্রটির লাইফ টাইম বা জীবনসীমা হচ্ছে ৫০ বছর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ২০২১ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১২০০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিট চালু করা হবে। এই কেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য রাশিয়াই ফেরত নিয়ে যাবে। দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতে এটিই সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর আগের বড় প্রকল্প নির্মাণাধীন পদ্মাসেতুর নির্মাণ খরচ নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বর্তমান সরকারের হাতে নেওয়া মেগা প্রজেক্ট বা ফাস্ট ট্রাক প্রজেক্টেরও অন্যতম একটি  অংশ যা সমালোকদের দৃষ্টিতে সরকারের “উচ্চাভিলাসী” পদক্ষেপ। পরিবেশ ও জনগণের ওপর এই প্রকল্পের প্রভাব প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “অ্যাটোমিক বললেই মনে হয় জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকির কথা। এজন্য অসচেতন মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হওয়া স্বাভাবিক। আধুনিক অ্যাটোমিকের অনেক উন্নতি হয়েছে।” যে কারণে পরিবেশ বা জনগণের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা নেই বলে তিনি জানান।

ইতিহাস:

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের প্রথম প্রস্তাব করা হয় ১৯৬১ সালে পাকিস্তান আমলে। এ সময় তৎকালিন সরকার ২৫৩ দশমিক ৯০ একর জমি বরাদ্দ দেয়। ঐ সরকার বেশকিছু পর্যালোচনার ভিত্তিতে ১৯৬৩ সালে পাবনার রূপপুরে ৭০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের অনুমোদন দেয়। ১৯৬৪ এবং ১৯৬৬ সালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে আলোচনা হয় কানাডিয়ান সরকারের সাথে যা পরবর্তি কয়েক বছর সুইডিশ সরকার এবং নরওয়েজিয়ান সরকারের সাথেও আলোচনা চলতে থাকে, কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তব কোন অগ্রগতি হয়নি। ১৯৬৪ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য সকল যন্ত্রপাতি বাংলাদেশের উদ্দেশে জাহাজে করে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই জাহাজ পাকিস্তান তাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে তা চট্টগ্রাম বন্দরে না এনে করাচিতে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে আলোচনা হলেও কোন ফলাফল পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ২০০৯ সালের বাংলাদেশ সরকার পুনরায় রাশিয়ার সাথে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের আলোচনা শুরু করে এবং একই বছরের ১৩ই ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বা MOU (Memorandum of Understanding) স্বাক্ষরিত হয়। তবে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ২০১০ সালের ২১ মে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার বিষয়ক একটি Framework আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় মস্কোতে। যার ফলশ্রুতিতে ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ সালে পাবনার রূপপুরে দুই হাজার চারশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য রাশিয়ার এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই করে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তি বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে সাত বছর। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদনে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদকাল হবে ষাট বছর ধরে।

সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিতঃ

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন অনেক ব্যয়বহুল হলেও এ প্রযুক্তির অনেক সুবিধাও রয়েছে। 

প্রথমত, গত কয়েক দশকে পারমাণবিক প্রযুক্তির অনেক উন্নতি হয়েছে এবং এধরনের প্লান্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতা অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রস্তাবিত তৃতীয় প্রজন্মের অত্যাধুনিক রিয়্যাক্টরে নিরাপত্তার ব্যবস্থা দ্বিতীয় প্রজন্মের রিয়্যাক্টরের (যেগুলো জাপানের ফুকুশিমা প্লান্টে ব্যবহৃত হয়েছিল) তুলনায় অনেক উন্নত, তাই যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে নিরাপত্তার ঝুঁকিও অনেক কম।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার নিত্তনৈমিত্তিক খরচ(operating cost) অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় অনেক কম। এর মূল কারণ হচ্ছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক জ্বালানি খরচ কয়লা বা গ্যাসের তুলনায় অনেক কম। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি হিসেবে সাধারনত ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হয়, পারমাণবিক ব্যবহার ছাড়া যার বিকল্প ব্যবহার খুব বেশি নেই। অধিকন্তু, অল্প পরিমান ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, যার ফলে কাঁচামাল হিসেবে ইউরেনিয়ামের ঘাটতি বিশ্বে আরও একশ বছরের মধ্যেও দেখা দেবেনা বলেই গবেষকদের ধারণা।

তৃতীয়ত, তৃতীয় প্রজন্মের রিয়্যাক্টর ব্যবহৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল প্রায় ৬০ বছর যা অন্যান্য জ্বালানি নির্ভর উৎপাদন কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে, প্লান্ট স্থাপনার প্রাথমিক ব্যয় বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক কম অপারেটিং খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অর্থনৈতিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রতিযোগিতামূলক। জ্বালানি হিসেবে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস বা কয়লার চাহিদা বেশি হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে এসব জৈব জ্বালানির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরেনিয়ামের তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়বে বলে ধরে নেয়া যায়। আর কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির এ অসম হার বিবেচনা করে বলা যায়, ভবিষ্যতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপারেটিং খরচ গ্যাস বা কয়লাভিত্তিক পদ্ধতির তুলনায় আরও সাশ্রয়ী হবে, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎকে অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় করে তুলবে।

চতুর্থত, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ নেই বললেই চলে। এই পদ্ধতিতে জৈব জ্বালানিকে পোঁড়ানো হয়না বলে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ অত্যন্ত নগন্য।

পঞ্চমত, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এ ক্ষেত্রে বৈচিত্র আনা জরুরি। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, আমাদের দেশের শতকরা প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে। দেশের গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে গেলে, শুধু কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ঘাটতি পূরণ করা যাবে না। তাই, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমাদের গ্যাস আমদানি করতে হবে, যা হবে খুবই ব্যয়সাপেক্ষ। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক দিকের পাশাপাশি রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সুসম্পর্কের ব্যাপারটিও হয়ে উঠবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পক্ষান্তরে, ইউরেনিয়াম অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং সহজলভ্য হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ব্যাপারটি এতো ঝুঁকিপূর্ণ হবেনা।

প্রকৃতপক্ষে, পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকে নবায়নযোগ্য (যেমন বায়ু বা সৌর) বিদ্যুতের সাথেই তুলনা করেন। কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিবেশ দূষণের ফলে যে ক্ষতি হয়, সেটিকে যদি ঐ পদ্ধতিতে উৎপাদিত খরচের সাথে যোগ করা হয়, তাহলে পারমাণবিক বিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুবিধা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত কার্বন ক্রেডিটের ধারণা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণিত হবে।

পরিবেশ গত ঝুকিঃ

জার্মান বিজ্ঞানী গেরহার্ড উলেনব্রুক বলেন “প্রথমে মানুষ পরমাণুকে টুকরা করেছে, এখন মানুষকে টুকরা করে পরমাণু।”

বর্তমানে সারা দুনিয়াতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৪০টির মত, অপর দিকে এ পর্যন্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনা ও বিপর্যয় ঘটেছে শতাধিকের মত। আর এসব দুর্ঘটনা ও বিপর্যয়ের কারণে মানুষের প্রাণহানী, জীববৈচিত্র ধ্বংসসহ সম্পদের যে তি হয়েছে তা কয়েক হাজার বছরেও কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়। পারমাণবিক প্রযুক্তি আজ যে কত অনিরাপদ ও বিপদজনক ধ্বংস ডেকে আনছে তার ফলাফল ভয়ংকর। সে কারণে এ ধরণের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এর অবকাঠামো নির্মাণ হয়ে থাকে দুর্ঘটনা ও বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে, একই সাথে এই ধরণের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার স্থান নির্ধারণ করা হয় নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে ও মানুষের বসতি থেকে নিরাপদ অনেক দূরত্বে এবং ভূমিকম্পন মুক্ত পারমাণবিক চুল্লির মাথা ঠান্ডা রাখতে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ এলাকায়। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের জন্য রূপপুর সঠিক স্থান নয় বলে অনেকে মনে করছেন। রূপপুরের মত এতো অধিক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পৃথিবীর কোথাও এ ধরণের প্রকল্প নির্মাণের কথা কোন দেশ চিন্তাও করেনি।

 বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজনেই পৃথিবীর অধিকাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়ে থাকে সমুদ্রতীরে। কিন্তু রূপপুরে পানির উৎস হচ্ছে পদ্মা নদী। ভারত পদ্মার ৪০ কি.মি. উজানে ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার কারণে পদ্মা নদী আজ প্রায় মৃত নদী, রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হলে পদ্মা নদীকে কবর দেওয়ার শামীল হবে। সরকার বলছে পদ্মা শুকিয়ে গেলে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হবে, কিন্তু এতো বিপুল পরিমান পানি ভূ-গর্ভস্থ থেকে সংগ্রহ করা হলে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাবে বলেই মানুষের খাবার পানিসহ চাষাবাদের সেচের পানির মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হবে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে শুরু হবে হাহাকার, ধ্বংস হবে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা। এমনিতে ভূমিকম্পনের মত প্রাকৃতিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এ অঞ্চল, ফলে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা কতটুকু যুক্তি সংগত তা বলাই বাহুল্য।বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে তা রাশিয়ার ওপর এক ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি করে দেবে। কেননা শুধু রাশিয়ার প্রযুক্তি সহায়তা বা ইঞ্জিনিয়ারই নয়, বরং বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য যে কাঁচামাল দরকার হবে (ইউরেনিয়াম), তার সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সব সময় আমাদের সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে। এমনকি আমাদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুন্ন করে হলেও। এ প্রকল্প যতদিন চলবে ততদিন দুইটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারে? আমরা অতি সম্প্রতি দেখেছি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া আশির দশকে ইসরায়েলি বিমান হাজার মাইল উড়ে গিয়ে ইরাকের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা ফেলে তা ধ্বংস করে দিয়েছিল। আজকের দিনে আর যুদ্ধবিমানের প্রয়োজন নেই। ‘সাইবার ওয়ার’ই যে-কোনো পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস তথা অকার্যকর করার জন্য যথেষ্ট।ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। ১৯৮৬ সালে ঘটা চেরনোবিল পারমাণবিক পাওয়ার প্ল্যান্ট বিস্ফোরণে মুহূর্তেই মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে ৩১ থেকে ৫৬ জন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে হাজার হাজার মানুষ এই বিস্ফোরণের তেজষ্ক্রিয়তার কারণে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ওই অঞ্চলে পালিত গরুর দুধ খেয়ে অনেক শিশু থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। এই তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাব ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়েছে।এর আগে ১৯৫৭  সালে সেই সোভিয়েত রাশিয়াতেই একটা নিউক্লিয়ার ফুয়েল প্রসেসিং প্ল্যান্টে দুর্ঘটনা ঘটে। সোভিয়েত রাশিয়ার নীরব নীতির কারণে এই দুর্ঘটনার হতাহতের সংখ্যা সঠিক জানা যায় না। তবে ১৯৯২ সনে সোভিয়েত-উত্তর রাশিয়ান সরকারের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫৭ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত ওই দুর্ঘটনার জনিত কারণে মোট মৃতের সংখ্যা ৮০১৫-তে দাঁড়িয়েছিল।মনে রাখতে হবে চেরনোবিলের দুর্ঘটনাও ঘটেছিল সোভিয়েত রাশিয়ায়, ক্ষতির প্রকৃত সংখ্যা তাই এখনও অজানা। এসব জেনে জাপান কিন্তু খুব আধুনিক প্রযুক্তির পারমাণবিক পাওয়ার প্ল্যান্ট বানিয়েছিল। কিন্তু ভূমিকম্প আর সুনামিতে তাদের ফুকুশিমা দাইইচি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট দুর্ঘটনার শিকার হয় ২০১১ সালে। এসব বিচারে বিশেজ্ঞরা একমত যে, নিরাপদ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বলে কিছু নাই।পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্যপদার্থ থেকে নির্গত তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের ফলে পরিবেশ দূষণের মাত্রাও খুব ভয়াবহ। এই বর্জ্য পদার্থের মধ্যে থাকে প্লুটোনিয়াম পরমাণুর বিভিন্ন আইসোটোপ। যেমন প্লুটোনিয়াম ২৩৯, ২৩৮, ২৪১ ইত্যাদি। এগুলোর তেজষ্ক্রিয়তা বজায় থাকে হাজার হাজার বছর ধরে, অর্থাৎ হাজার বছর ধরেই এগুলো দূষণ ছড়ায়। এই বর্জ্যসমূহ নিরাপদে নিষ্কাশনের কোনো উপায় এখনও আবিষ্কার করা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র এত দিন লাসভেগাস থেকে ১০০ মাইল দূরে পাহাড়ের গভীরে এই পারমাণবিক বর্জ্য পুঁতে রাখত। ২০১০ সালে পাহাড়ে পুঁতে রাখার কর্মসূচি পরিত্যক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ফান্ড রয়েছে, যার পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে আমরা এই পারমাণবিক বর্জ্য পুঁতে রাখব কোথায়! ঘণবসতিপূর্ণ এ দেশে এমন কোনো পরিত্যক্ত অঞ্চল নেই যেখানে আমরা পারমাণবিক বর্জ্য সরিয়ে রাখতে পারি। মাটির গভীরে পুঁতে রাখলে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে যা আমাদের দেশে বিরাট বিপর্যয় নামিয়ে আনবে। ফলে পারমাণবিক বর্জ্য আমাদের ঘাড়ে এক বিরাট সমস্যা হিসাবে আবিভূত হবে।তাছাড়া পারমাণবিক বর্জ্য এমনিতেই তেজষ্ক্রিয়তা ছড়ায় যা ক্যান্সারসহ নানারকম রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়। আবার, জেনেটিক মিউটেশন ঘটানোয় ভূমিকা রাখে, ফলে আক্রান্ত অঞ্চলে নানা রকম শারীরিক ত্রুটি নিয়ে মানবশিশু জন্মাতে পারে।পারমাণবিক বর্জ্যের তেজষ্ক্রিয়তা নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতি এখন মানুষের অজানা। যত ভাবেই তা ঢেকে রাখা হোক, তেজষ্ক্রিয়তা ছড়ানোর সম্ভাবনা থেকেই যায়।পরিবেশে তেজষ্ক্রিয় উপাদান ছড়িয়ে পড়লে খাদ্য শৃঙ্খলে তা ছড়িয়ে পড়ে, এবং মানুষসহ নানা প্রাণীর উপর প্রাণঘাতী প্রভাব পড়ে। একে তো পারমাণবিক বর্জ্য থেকে তেজষ্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়াতে থাকে, অন্যদিকে একে সরিয়ে অন্য কোথাও নেয়ার রিস্ক আরও বেশি। দেখা গেছে, পারমাণবিক বর্জ্য নিয়ে ফেলা হয় আদিবাসীদের অঞ্চলে, তাদের প্রতিবাদকে রাষ্ট্র সহজেই দমিয়ে দিতে পারে তাই।এই বর্জ্য নিষ্কাশনের সমস্যা ছাড়া আরও সমস্যা আছে। পারমাণবিক চুল্লীকে ঠাণ্ডা রাখার জন্য তাকে ঘিরে ঠাণ্ডা পানির প্রবাহ চালানো হয় (জাপানে দুর্ঘটনা ঘটেছিল ওই পানি দিয়ে ঠান্ডা করার প্রযুক্তি বা কুলিং সিস্টেম অচল হয়ে পড়ায়)। যদি কোনোভাবে ওই পানির পাইপে ছিদ্র বা ফাটল সৃষ্টি হয় তাহলে প্রতিদিন চুল্লীতে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ পানি তেজষ্ক্রিয়াযুক্ত হয়ে পড়বে। এর ফলে ওই পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত নদী বা সাগরের পানিও দূষিত করবে। জাপানের ফুকুশিমা ও আমেরিকার থ্রি মাইল আইল্যান্ডের ঘটনায় আমরা জানি তেজষ্ক্রিয়তাযুক্ত পানি এই মূল পানির প্রবাহের সাথে মিশে আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার, এমনকি প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারের জনগণকেও বিরাট স্বাস্থ্যঝুঁকির মাঝে ফেলেছে। আমাদের এই নদীবহুল-পানিবহুল দেশে একটি ছোট ঘটনাই কি যথেষ্ট নয় সারাদেশের মানুষকে ক্যান্সারের ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দিতে? তাছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে লোকদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র (গ্লাভস, পোষাক ইত্যাদি) পরিপূর্ণভাবে তেজষ্ক্রিয়ামুক্ত করার পদ্ধতি এখনও জানা নেই। ২০ জানুয়ারি ২০০০ নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক রিপোর্টে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে পারমাণবিক অস্ত্র কারখানায় কর্মরত ৫ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে। এসব পরিস্থিতি বোঝাতেই নিউজিল্যান্ডের নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী জন পোর্টার বলেছিলেন, “মানুষ এখনও পরমাণু চুল্লীর সাথে বিশ্বাসে ঘর করবার মতো বড় হয়ে ওঠেনি।”এসব বিপদের দিক কোনো কিছুকেই বিবেচনায় না নিয়ে সরকারের তরফ থেকে এখন যে কথাটি বলা হচ্ছে তাহল, রূপপুরে আনা হবে তৃতীয় প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর, যা অত্যন্ত নিরাপদ। তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় দ্বিতীয় প্রজন্মের তুলনায় এতে দুটি বৈশিষ্ট্য উন্নততর - এতে তেজষ্ক্রিয়া পানি বাইরে আসবে না এবং অধিক পুরু স্টীলের নিরাপত্তা বেষ্টনী। এর ফলে খরচও হবে প্রায় চার গুণ। কিন্তু প্রশ্ন হল, এতসব জানার পরও জার্মানি, ফ্রান্স ও আমেরিকার মতো প্রযুক্তিতে উন্নত দেশ কেন নতুন পারমাণবিক চুল্লির বিষয়ে অনাগ্রহী? ইতোমধ্যেই বিজ্ঞানীরা চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছেন, এবং সেটা নিশ্চয়ই নিরাপত্তার কথা ভেবেই। যদি তৃতীয় প্রজন্মের প্লান্ট যথেষ্ট নিরাপদ হতো তাহলে এতো দ্রুত কি বিজ্ঞানীরা তা পরিবর্তনের কথা ভাবতেন? বলা দরকার যে অতি উন্নতমানের ইউরেনিয়াম ব্যবহার না করলে তৃতীয় প্রজন্মের প্লান্টের কর্মদক্ষতা ব্যাপক পরিমাণে হ্রাস পায় এটা প্রমাণিত। এর কি কোনো সমাধান আমাদের হাতে আছে? পণ্য বিক্রেতা সবসময়ই বিজ্ঞাপনে তার পণ্যের গুণাগুণ বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলে, এমনকি যা নেই তাও প্রচার করে। কিন্তু ক্রেতাও যখন বিক্রেতার ভাষায়, বিজ্ঞাপনের ভাষায় কথা বলে তখন সত্য-মিথ্যা যাচাই করা সত্যিই দুরূহ হয়ে পড়ে।

অর্থনৈতিক ঝুকিঃ

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রচুর পরিমাণ এককালীন অর্থের প্রয়োজন হয়। এই খরচ সমক্ষমতা সম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বা গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের চেয়ে চারগুণ বা তার চেয়েও বেশি হতে পারে। বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমআইটির হিসাব মতে, ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনকারি গ্যাস নির্ভর কেন্দ্র স্থাপন করতে যেখানে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলারই যথেষ্ট, সেখানে সমক্ষমতা সম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে খরচ পরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। 

যদিও সরকারি চুক্তির ভাষ্য অনুযায়ী রূপপুরের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার খরচ পড়বে, এই খরচের প্রাক্কলন (estimates) যথার্থভাবে মূল্যায়িত হয়েছে বলে বিশ্বাস করার পক্ষে জোড়ালো কোনো যুক্তি নেই। অবশ্য রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, তাদের প্রযুক্তির খরচ কম হওয়ার কারণ হচ্ছে, তাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা (competitive advantage), তবে কি এই সুবিধা এ ব্যাপারে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে দীর্ঘ সময় দরকার হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাথমিক হিসেবের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় হয়। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দেখলে দেখা যাবে, তাদের অনেক পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পেই প্রকৃত ব্যয় প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় তিনগুণ পর্যন্ত হয়েছে। এমনকি ফিনল্যান্ড বা ফ্রান্সে টিওলিসাডেন ভয়মা (Teollisuuden Voima) এবং ইলেকট্রিসিটি ডি ফ্রান্স (Electricite de France) এর মত বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে নির্মানরত প্রকল্পগুলোতেও প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়েছে এবং ঘোষিত সময়সূচির চেয়ে অনেক পিছনে পড়েছে। আর বাংলাদেশে এ ধরনের বড় বাজেটের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা এবং সম্ভাব্য দূর্নীতির কারনে প্রকল্পের খরচ এবং সময়সূচি উভয়েই যে পরিকল্পনাকে ছাড়িয়ে যাবে সেটি অনুমান করতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়েনা।পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে আর একটি বড় ঝুকি হচ্ছে, প্রকল্পের অর্থায়ন সংক্রান্ত খরচ (financing cost)। রূপপুরের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পরিকল্পিত পাঁচ বছরে সম্ভব হলে এবং অর্থায়নের খরচ শতকরা ৪.৫ শতাংশ হারে সরকারী খরচেই এ প্রকল্পের খরচ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছুবে অর্থাৎ প্রকল্পে উৎপাদন শুরু হওয়ার আগেই ৫০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের জন্য ব্যয় হবে। আগেই বলেছি, সরকারের প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবসম্মত নয় এবং তাই এই প্রকল্পের খরচ ২ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে অনেক বেশি পড়বে যা অর্থায়ন সংক্রান্ত ব্যয়কে আরও অনেক বাড়িয়ে দেবে। এতো গেল প্লান্ট স্থাপনকালীন সময়ের কথা, আর উৎপাদন শুরু হওয়ার পরে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ শোধ করতে গেলে যে আরও বড় পরিমাণ সুদ পরিশোধ করতে হবে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রকৃত খরচ নিয়ে সব সময় একটা লুকোছাপা আছে, কেননা এটা সবচে খরুচে বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর ব্যয়ভার বাড়তেই থাকে। আরেকটা বিষয় নিয়ে তালবাহানা হয়, সেটা হল, দুর্ঘটনা ছাড়াও নিউক্লিয়ার রিয়াক্টর পরিবেশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়। এই কারণে দেখা যায় প্রায়ই তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা বিষয়ক আইনগুলো বদলে দুর্বল করা হয়, যাতে কর্পোরেটগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া না যায়।দেখা গেছে নদীর উপকূলে যেসব পারমাণবিক রিয়াক্টর বসানো হয়, সেখান থেকে আসা তেজষ্ক্রিয়তা নদীর বিশেষ কিছু প্রাণীকে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত করে। আবার, রিয়াক্টর ঠাণ্ডা করতে বিপুল পরিমাণ পানি লাগে; সেই পানির জোগান না থাকলে চুল্লি চলে না, বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না, কিন্তু তাতে পুরো প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ভার বন্ধ হয় না।তাছাড়া, এ ধরনের প্রকল্পের জন্য যে স্তরের জাতীয় নিরাপত্তা জরুরি হয়ে পড়ে তাতে জনগণ বাধ্য হয় তাদের গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে নানারকম নিরাপত্তার আইনের নাগপাশে শৃঙ্খলিত হতে। রাষ্ট্র পর্যবসিত হয় একটি কর্পোরেশনে। জনগণের হাতে আর কোনো ক্ষমতাই থাকে না।

ঝুকি মোকাবেলায় গৃহিত পদক্ষেপ:

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, নির্বাচন করা হয়েছে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বাধুনিক রিঅ্যাক্টর- ভিভিইআর-১২০০ (AES 2006)।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বাধ্যবাধকতা প্রতিপালন এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। মানব সম্পদ উন্নয়ন, রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশের ভারসাম্য সংরক্ষণ প্রভৃতি কাজ যথাযথ গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নির্বাচিত পারমাণবিক চুল্লিতে নিম্নবর্ণিত পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকবে:

১. ফুয়েল পেলেট:

নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রথমটি হচ্ছে ফুয়েল পেলেট, যা অতি উচ্চ তাপমাত্রায় তার জ্বালানী বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে। ফুয়েল পেলেট সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরী করা হয়, ফলে তেজস্ক্রি  ফিশন প্রোডাক্টসমূহ পেলেটের ভেতরে অবস্থান করে।

২. ফুয়েল ক্ল্যাডিং: 

ফুয়েল পেলেটগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরী ফুয়েল ক্ল্যাডিং দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। বিশেষ কোন কারণে সামান্য পরিমাণ ফিশন প্রোডাক্ট ফুয়েল পেলেট থেকে বের হয়ে আসলেও তা এই ক্ল্যাডিং এ ভেদ করতে পারবে না।

৩. রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল:

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের জন্য বিশেষ মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুরু ইস্পাতের প্রেশার ভেসেল তৈরী করা হয় যা, উচ্চ তেজষ্ক্রিয় অবস্থাতেও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

৪. প্রথম কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং:

রিইনফোর্সড কনক্রিট দিয়ে ১.২ মিটার পুরুত্বের প্রথম কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং তৈরী করা হয়, যা যেকোন পরিস্থিতিতে তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখে।  

৫. দ্বিতীয় কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং:

নিরাপত্তা ব্যবস্থা অধিকতর জোরদার করার জন্য আধুনিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টগুলোতে  প্রথম কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং-এর পর আরও  ০.৫ মিটার পুরুত্বের আরও একটি কন্টেইনমেন্ট  বিল্ডিং যুক্ত করা হয় যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিমান দুর্ঘটনা ইত্যাদি থেকে প্লান্টকে সুরক্ষা করে।

📷

এই পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের কারণে মনুষ্য সৃষ্ট ঘটনা/দূর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন- শাক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভুমিকম্প, বন্যা ইত্যাদিও প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষম থাকবে এই পারমাণবিক চুল্লি।এই পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য ছাড়াও এই প্লান্টের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও প্লান্ট নিরাপদ থাকবে।এছাড়া ৫.৭ টন পর্যন্ত ওজনের বিমানের আঘাতেও এটি অক্ষত থাকবে। সর্বশেষ প্রজন্মের অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্বলিত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে রিঅ্যাক্টর বিল্ডিং থেকে ৮০০ মিটারের (এক্সক্লুসিভ জোন) বাইরেই স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যাবে। 

উপসংহারঃ

পরিশেষে বলতে চাই, দেশে দ্রুতবর্ধনশীল বিদ্যুতের চাহিদার কথা বিবেচনা করে সরকার যে বিকল্প পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে সেটি প্রশংসনীয়। তবে, অতীতের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার মতো এতো বড় একটি বাজেটের প্রকল্প দূর্নীতি-গাফিলতির কারণে মুখ থুবড়ে পড়ুক সেটি এদেশের মানুষ দেখতে চায় না। দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দিককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং দূর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখিয়ে ঘোষিত সময়ের মধ্যে, উপযুক্ত অর্থায়নের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হোক এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

Comments