৪১তম বিসিএস রিটেন বাংলা ও ইংরেজির প্রস্তুতি - মো. ফয়সাল তানভীর
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ৪১তম বিসিএসের প্রিলির ফল। এবার রিটেনের পালা। এই পরীক্ষার জন্য দরকার দীর্ঘ প্রস্তুতি। নভেম্বরে পরীক্ষা হওয়ার কথা। অর্থাৎ হাতে সময় আছে তিন-চার মাস! এই সময়ের মধ্যে বাংলা ও ইংরেজিতে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির জন্য কী কী করণীয়, জানাচ্ছেন ৩৮তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডার মো. ফয়সাল তানভীর
বাংলা প্রথম পত্র
বাংলা প্রথম পত্রের সিলেবাসে ব্যাকরণের জন্য ৩০, ভাবসম্প্রসারণ ও সারাংশ/সারমর্মে ৪০ (২০+২০) এবং সাহিত্যবিষয়ক প্রশ্নে (১০টি) ৩০ নম্বর বরাদ্দ থাকে। ব্যাকরণ অংশের টপিকগুলো নির্ধারিত থাকে। যেমন—শব্দ গঠন, বানান ও বানানের নিয়ম, বাক্য শুদ্ধি ও প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, প্রবাদের নিহিতার্থ ব্যাখ্যা ও বাক্য গঠন। যেকোনো গাইড বই থেকে ব্যাকরণ অংশটি চর্চা করা যেতে পারে। এর বাইরে সৌমিত্র শেখরের ‘বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য জিজ্ঞাসা’, সমর পালের ‘প্রবাদের উৎস সন্ধান’ এবং মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের ‘শুদ্ধিকরণ’ বইগুলো পড়েও প্রস্তুতিকে আরো এগিয়ে রাখতে পারেন।
ভাবসম্প্রসারণ ও সারাংশ লিখতে হবে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে। ভাবসম্প্রসারণে উল্লিখিত বিষয় ছাড়া নতুন কোনো ভাবের অবতারণা করা যাবে না; কোনো উক্তি বা কোটেশনও ব্যবহার করা যাবে না। তবে ভাবসম্প্রসারণে তথ্য-উপাত্তও ব্যবহার করা যাবে। সারাংশ/সারমর্মের আকার হবে মূল লেখার এক-তৃতীয়াংশ।
সাহিত্যবিষয়ক ১০টি প্রশ্নের প্রস্তুতির জন্য বিগত বিসিএস (১০ম-৪০তম) লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নগুলো আগে ভালো করে দেখুন। এখান থেকে প্রায় অর্ধেক কমন পড়ে। এর বাইরে বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ, চর্যাপদ এবং মধ্যযুগীয় সাহিত্য, পিএসসির সিলেবাসে নির্ধারিত ১১ জন লেখকের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়বস্তুর ওপরও ভালো দখল থাকতে হবে। বিখ্যাত রচনাগুলোর বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ, তৎকালীন সমাজজীবন থেকে দুই-তিনটি প্রশ্ন আসতে পারে।
পাঠ্যসূচিতে রাখতে পারেন হুমায়ুন আজাদের ‘লাল নীল দীপাবলী’ (প্রাচীন এবং মধ্যযুগের জন্য), সৌমিত্র শেখরের বই থেকে আধুনিক যুগের সাহিত্য এবং অগ্রদূত প্রকাশনীর বাংলা বই।
সাহিত্যের প্রশ্নের উত্তরের সময় ভাবাবেগসমৃদ্ধ বাক্য ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনীয় উক্তির ব্যবহার উত্তরের গুণগত মান বাড়িয়ে দেবে। বাংলা ব্যাকরণ ও সাহিত্য— এই দুই অংশে পূর্ণ নম্বর তোলা সম্ভব। তাই এই দুটি বিষয়ের প্রস্তুতি সবচেয়ে গোছানো হওয়া উচিত।
বাংলা দ্বিতীয় পত্র
বাংলা দ্বিতীয় পত্র একটি ঐচ্ছিক বিষয়, যা শুধু জেনারেল এবং উভয় ক্যাডারের জন্যই প্রযোজ্য। এই পত্রে রয়েছে ইংরেজি-বাংলা অনুবাদ (১৫ নম্বর), কাল্পনিক সংলাপ (১৫), পত্রলিখন (১৫), গ্রন্থ সমালোচনা (১৫) ও রচনা (৪০)।
বাংলা অনুবাদের প্রস্তুতি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের অনুবাদের প্রস্তুতির সঙ্গে নেওয়াই ভালো। কাল্পনিক সংলাপ লিখতে হবে নিজের আইডিয়া থেকে, তবে সেখানেও তথ্যবহুল আলোচনা জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। দরখাস্ত অথবা সম্পাদক বরাবর পত্র লেখার সময় পরীক্ষার খাতার বাঁ পাশ থেকে শুরু করে দুই অথবা তিন পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। লেখার ভাষা সংবাদপত্রের ভাষার মতোই হওয়া উচিত।
গ্রন্থ সমালোচনার জন্য শুরুতেই সাম্প্রতিক সময়ের উল্লেখযোগ্য বইগুলো সম্পর্কে ধারণা নিন। ‘শীকর’ বই থেকেও পড়ে নিতে পারেন। প্রতিটি ইস্যুভিত্তিক ভালো কোনো বইয়ের গ্রন্থ সমালোচনা তৈরি করে রাখাটা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন—ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী অথবা আত্মজীবনী, বাংলাদেশের ইতিহাস সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়বস্তুর ওপর লেখা একটি করে বই। গ্রন্থ সমালোচনার ক্ষেত্রে অনেকেই কেবল বইয়ের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন, এমনটা না করাই ভালো।
গ্রন্থ সমালোচনায় করণীয় :
* বইটি লেখার উদ্দেশ্য এবং নামকরণের সার্থকতা
* তৎকালীন সমাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের বিশ্লেষণ
* লেখক সম্পর্কে কয়েকটি মন্তব্য
* একই বিষয়ে লিখিত অন্যান্য লেখকের বইয়ের সঙ্গে তুলনামূলক পার্থক্য/সম্পর্ক তুলে ধরা।
* পাঠকদের জন্য নির্দেশনা।
সব শেষে রচনার জন্য পড়বেন সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলো। বাংলা ও ইংরেজি রচনার প্রস্তুতি একসঙ্গে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এর ফলে রচনার টপিক নির্ধারণ এবং তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। রচনার ক্ষেত্রে গতানুগতিক লেখার বাইরে গিয়ে তথ্যবহুল লেখার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা, জাতিসংঘের বার্ষিক রিপোর্ট, মানব উন্নয়ন সূচক, জলবায়ুবিষয়ক সিওপি (কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস) সম্মেলনের সর্বশেষ তথ্য ও অর্থনীতিবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালের প্রতিবেদন নোট করে রাখবেন। প্রতি মাসের চাকরির প্রস্তুতি সহায়ক পত্রিকা বা ম্যাগাজিন, সম্পাদকীয় সংকলন থেকে এগুলো টুকে রাখতে পারেন। এ ছাড়া নিয়মিত পত্রিকাও পড়তে হবে।
বাংলা উভয় পত্রে ভালো করার জন্য কিছু বিষয় খেয়াল করবেন :
* বানান ভুল এবং গুরুচণ্ডালী দোষের পরিহার
* যতিচিহ্নের সঠিক ব্যবহার
* ভুল তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার না করা।
ইংরেজি প্রথম পত্র
বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা সাধারণত ইংরেজি প্রথম পত্র দিয়েই শুরু হয়। ইংরেজি পরীক্ষাকে অনেকেই বলেন ‘ক্যাডার নির্ধারণী পরীক্ষা’। ১০০ নম্বরের পরীক্ষার সিলেবাস পুরোটা জুড়েই থাকে একটা Unseen comprehension। এই Comprehension-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়া ৩০ নম্বরের ১০টিই Thematic questions, ৩০ নম্বরের Grammar based প্রশ্ন, ২০ নম্বরের Summary (Comprehension থেকে) ও ২০ নম্বরের Letter to editor।
Unseen comprehension তুলনামূলক জটিল বিষয়বস্তুর ওপর ও বড় আকারে হয় সাধারণত। তাই গাইড বই থেকে চর্চার পাশাপাশি নিজের Reading skill বাড়ানো খুব দরকার। এর জন্য ইংরেজি পত্রিকা থেকে প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ বা সংবাদ পড়ার পাশাপাশি নিজের vocabulary সমৃদ্ধ করতে অজানা শব্দগুলোকে নোট করে রাখা উচিত।
Thematic questions-এর উত্তরগুলো হবে সংক্ষিপ্ত এবং টু দ্য পয়েন্ট; ৩ লাইনের ভেতর প্রশ্নের উত্তর সীমাবদ্ধ থাকলে ভালো হয়।
Grammar based practices (৩০ নম্বর) অংশে ভালো করতে হলে প্রার্থীকে ভোকাবুলারি বেশ সমৃদ্ধ থাকতে হবে। এর বাইরে ইংরেজি ভাষাশৈলী যেমন—Parts of speech, synonym antonym, phrase and idioms, active passive, punctuation, degree, transformation of words/sentence ইত্যাদির ওপরও ভালো ধারণা থাকা জরুরি।
২০ নম্বরের Summary শুরু করতে হবে একটা Topic sentence দিয়ে। শুরুর এই বাক্যটি এমন হতে হবে, যাতে Comprehension-এর মূল Themeটাকে শুরুতেই address করা যায়। Comprehension থেকে কোনো লাইন হুবহু কপি করা যাবে না। একটি Standard summary-র আকার হওয়া উচিত মূল লেখাটির এক-তৃতীয়াংশ।
সব শেষে আসছে, Editorial letter অথবা Report writing। এর বিষয়বস্তুও আসে উল্লিখিত comprehension থেকে। Letter-এর standard formatটা যেকোনো একটি ভালো মানের বই থেকে কিংবা গুগলে খোঁজ করে দেখে নিতে পারেন। ফরম্যাট ঠিক থাকলেই সাধারণত এখানে অনেক ভালো নম্বর তোলা যায়। এ ধরনের চিঠি লেখা হয় কোনো সমস্যা এবং তার সমাধানকেন্দ্রিক। তাই খেয়াল রাখবেন, সংশ্লিষ্ট সমস্যাটি পয়েন্ট আকারে উপস্থাপন এবং তার তথ্যবহুল, বাস্তবসম্মত সমাধান যেন আপনার লেখায় উঠে আসে।
পাঠ সহায়িকা :
* বিসিএস লিখিত প্রশ্নব্যাংক।
* Grammar অংশের জন্য জাহাঙ্গীর আলমের Master বই, ওরাকল গাইড এবং অ্যাসিওরেন্স ডাইজেস্ট। জয়কলি Cliffs & Barron’s TOEFL (বাংলা অনুবাদসহ ব্যাখা)।
* BBC Learning English (ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল)।
* Vocabulary-র জন্য কোনো বই থেকে মুখস্থ করার চেয়ে চর্চা করাটা বেশি কার্যকর। অপরিচিত কোনো শব্দ দেখা বা শোনামাত্রই তার অর্থ জেনে খাতায় নোট করে নিন।
ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র
১০০ নম্বরের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে টপিক থাকে মোট ৩টি—বাংলা থেকে ইংরেজি Translation (২৫), ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ (২৫) ও Essay (৫০)। Essay-র টপিক হয় সমসাময়িক বিষয়ের ওপর আর উত্তরে এর শব্দসংখ্যা রাখতে হয় ১০০০-এর মধ্যে।
Translation-এ ভালো করতে হলে বেশি বেশি চর্চা করতে হবে। অনুবাদের ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুবাদের চেয়ে ভাবানুবাদটা বেশি গ্রহণযোগ্য। Translation/অনুবাদের বাক্যগুলো আকারে বড় এবং অপরিচিত শব্দের প্রাধান্য থাকে। আমরা যদি complex sentenceগুলোকে ছোট ছোট ভাগ করে এবং অপরিচিত শব্দগুলোর বাক্যের মাঝে অবস্থান বিবেচনা করে প্রাসঙ্গিক অর্থ (contextual meaning) বের করতে পারি, তাহলে অনুবাদের কাজ সহজ হয়ে যায়। এখন থেকেই প্রতি সপ্তাহে কয়েক পৃষ্ঠা অনুবাদ করতে থাকুন। এর জন্য অ্যাসিওরেন্স ডাইজেস্ট ও ক্যাডার’স অনুবাদবিদ্যা বইগুলো বেশ কাজের।
Topic related essay (৫০ নম্বর)-তে তিনটি রচনার মধ্যে একটি লিখতে হয় পরীক্ষার খাতায়, যেগুলোর বিষয়বস্তু মূলত সাম্প্রতিক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুভিত্তিক হয়। যেমন ধরা যাক, Economic Development of our Country, Climate Related Issue, Political Topics of National and International Level, History and Culture of our Country ইত্যাদি। এর বাইরে, নিখাদ সাহিত্য সম্পর্কিত কোনো টপিকও থাকতে পারে, যেমন Your Favorite Book অথবা Favorite Writer। Essay লেখার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
প্রথমত, Introduction থেকে Conclusion পর্যন্ত Argument আকারে লেখাকে এগিয়ে নিতে হবে। নিজ Argument-এর সপক্ষে Relevant data, chart, pie chart, quotation, মানচিত্রের মতো Visual illustration এবং আরো অন্যান্য Concrete evidence তুলে ধরতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সব তথ্য-উপাত্তের সঠিক উৎস বা রেফারেন্স উল্লেখ করতে হবে। ডাটা ছক চার্ট ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো প্রকার প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া সমীচীন নয়।
তৃতীয়ত, Spelling mistake ও Grammatical error বিহীন লেখার মাধ্যমে পরীক্ষকের মন জয় করতে হবে।
রচনার প্রতিটি প্যারায় যথাযথ হেডিং দিতে হবে এবং তথ্য-উপাত্ত নীল কালির বলপয়েন্ট কলমের মাধ্যমে হাইলাইট করতে হবে। রচনার জন্য সহায়ক বই হিসেবে ‘বিসিএস লিখিত রচনা’ (ইউনিক) বইটিকে তথ্যবহুল মনে হয়েছে।
* ঘোষণা :
৪১তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার অন্যান্য বিষয়ের প্রস্তুতি পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ছাপা হবে।
Comments
Post a Comment